আমানতের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসছে

191
0
SHARE

ব্যাংক আমানতের উপর প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। জনস্বার্থ এবং ব্যাংকিং খাতের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা অটুট রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট পাসের দিন ব্যাংক আমানতের উপর প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে। আগামী ২৯ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য। জানা গেছে, অর্থ পাচার প্রতিরোধ, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স আনয়ন, ব্যাংকিং খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা, ব্যাংক আমানত বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে ইতোমধ্যে বাণিজ্য সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় আমানতের উপর প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারে অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাধারণ মানুষরাও আবগারি শুল্কের বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। তারা আবগারি শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে যোক্তিক মনে করেছেন না। তারা বলছেন, এতে ব্যাংকিংয়ের বিকল্প অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের মাধ্যমকে উৎসাহিত করা হবে।

রবিবার দিনভর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সচিবালয়ে অফিস করেন। ওই সময় তিনি বাজেট নিয়ে বাইরে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সেসব বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংক আমানতের উপর প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক নিয়ে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে তা ভ্যাট নিয়েও হয়নি। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী অবগত আছেন। এছাড়া এ বিষয়টিতে একেবারে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরাও ভয় পেয়ে গেছেন। তাই বাজেট পাসের দিন প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়া হবে- আপাতত এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বাজেট পাসের আগে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, ব্যাংকের আবগারি শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে যে হারে সমালোচনা হচ্ছে তাতে সরকার প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক থেকে পেছনে ফিরবে। জাতীয় সংসদে এ নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আমিও ব্যক্তিগতভাবে কথা বলব।

প্রসঙ্গত, প্রস্তাবিত বাজেটে এক লাখ টাকার উপর থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাখলে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হবে। যা বর্তমানে আছে ৫০০ টাকা। আর ১০ লাখ টাকার উপর থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যাংকে টাকা রাখলে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেটে রাখা হবে। যা বর্তমানে আছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। একই সঙ্গে ১ কোটি টাকার উপর থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যাংকে রাখলে আবগারি শুল্ক দিতে হবে ১২ হাজার টাকা, যা বর্তমানে আছে ৭ হাজার ৫০০ টাকা। ৫ কোটি টাকার উপর ব্যাংকে টাকা রাখলে কেটে নেয়া হবে ২৫ হাজার টাকা। বর্তমানে ৫ কোটি টাকার বেশি ব্যাংকে রাখলে ১৫ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক বাবদ কেটে রাখা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে আবগারি শুল্ক নিয়ে এই ঘোষণা আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ক্ষোভের সঞ্চার সৃষ্টি করেছে।

ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকিং সেক্টর থেকে আবগারি কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা উচিত। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা নিবে। ব্যাংকিং খাতে সরকারের এ ঋণ নির্ভরতা উৎপাদনশীল খাতের ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তথা সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য ব্যাংক লেনদেন করা হয়। বাজেটে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।

এতে আমানতকারী আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হবে। এছাড়া অর্থ ব্যাংক চ্যানেলে না যেয়ে ইনফরমাল চ্যানেলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য শুভ নয়। সংগঠনটির সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ বলেন, আমানতের উপর আবগারি শুল্কের নতুন প্রস্তাব বহাল থাকলে দেশ থেকে অর্থপাচার বেড়ে যাবে এবং রেমিটেন্স প্রবাহ আরও হ্রাস পাবে। এছাড়া মাল্টিপারপাসসহ ভূঁইফোর ও হায় হায় কোম্পানিগুলো উচ্চ সুদে সাধারণ মানুষের আমানত সংগ্রহ করবে। এতে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এটি প্রত্যাহার হওয়া উচিত।

জানা গেছে, আবগারি শুল্ক এক প্রকার পরোক্ষ কর যা দেশজ উৎপাদনের ওপর আদায় করা হয়ে থাকে। দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্য কারখানা থেকে খালাসের সময় এই শুল্ক আদায় করা হয়। বাংলাদেশে আবগারি ও লবণ আইন ১৯৪৪-এর আওতায় আবগারি শুল্ক আদায় করা হয়ে থাকে। জাতীয় সংসদে বিভিন্ন পণ্যের ওপর আরোপণীয় আবগারি শুল্ক হার নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে আদায়যোগ্য তথা কার্যকর শুল্কহার নিরূপণ করে। বাংলাদেশে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং পর্যায়ক্রমে অধিকাংশ পণ্যের ওপর আবগারি শুল্ক রহিত করে মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়। বর্তমানে গুটিকয়েক পণ্য ও দেশজ উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর আবগারি শুল্ক ধার্য আছে।

জানা যায়, ব্যাংকে আমানত অস্বাভাবিক হারে কমছে। মূলত সুদের হার কমায় আমানতকারীরা এখন আর ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী হচ্ছে না। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের সুদের হারও কমানো হচ্ছে বলে বলেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, সঞ্চয়ের বিনিময়ে প্রাপ্ত সুদ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে বেশি হতে হয়। অন্যথায় টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমায় সঞ্চয়কারীকে লোকসান গুনতে হয়। এই বাস্তবতায় আমানতের উপর আবগারি শুল্কের নতুন প্রস্তাব ব্যাংকিং খাতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন বলেন, ব্যাংকের আবগারি শুল্ক কোন বিবেচনায় বাড়ানো হলো তা বোধগম্য নয়। এখানে সুপ্ত ও গুপ্ত জিনিসটা সামনে আনা হয়েছে। তবে এই খাত থেকে খুব বেশি টাকা আসে তা কিন্তু না। বিষয়টি নিয়ে বেশি সমালোচিত হওয়ার আগেই প্রস্তাবিত শুল্ক প্রত্যাহার করা মঙ্গলজনক হবে বলে মনে করেন তিনি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY