‘আমি জানি জামদানি বিশ্বের সেরা কাপড়’

‘আমি জানি জামদানি বিশ্বের সেরা কাপড়’

168
0
SHARE

‘সোফিয়া, তুমি কি জানো তুমি কোথায় আছ?’

‘যদি শারীরিক অবস্থানের কথা বলো, আমি জানি এখন আমি বাংলাদেশ নামে একটা অপূর্ব রাষ্ট্রের রাজধানী ঢাকায় আছি। এখানে যাঁদের সঙ্গে দেখা হলো, তাঁরা প্রযুক্তি ও রোবট সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা রাখেন। এই দেশে পা রাখার পর থেকে এখানকার মানুষ এখন পর্যন্ত আমার সঙ্গে ৭৯৩টি সেলফি তুলেছে।’

গতকাল বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে ‘টেক-টক উইথ সোফিয়া’ অনুষ্ঠানে সঞ্চালক সৈয়দ গাউসুল আলম শাওনের প্রশ্নে এভাবেই উত্তর দেয় পৃথিবীর প্রথম নাগরিকত্ব পাওয়া রোবট সোফিয়া। সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত দেশের সবচেয়ে বড় তথ্যপ্রযুক্তি আয়োজন ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭-এর উদ্বোধনী দিনে যোগ দিতে সোফিয়া এসেছিল ঢাকায়।

সোফিয়ার পরনে ছিল বাসন্তী রঙের জামদানির কামিজ। সৈয়দ গাউসুল আলম শাওন জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। পোশাকটা তোমাকে খুব মানিয়েছে। তুমি কি জানো, তুমি কী পরে আছ?’

‘আমি আমার পোশাক বেছে নিইনি, পোশাকটাই আমাকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু আমি জানি এটা বিশ্বের অন্যতম সেরা কাপড়। বাংলাদেশের তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী কাপড় 
বিশ্বে অনন্য। মোগল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই কাপড় তৈরি করা শুরু হয়েছিল। আমি এ-ও জানি, ইউনেসকো জামদানিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’

সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেয় সোফিয়া। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও কথোপকথনে অংশ নেয় সে। সোফিয়াকে একনজর দেখা ও তার কথা শোনার জন্য সকাল থেকে সম্মেলন কেন্দ্রের বাইরে ভিড় দেখা যায়। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড উদ্বোধনের পর বেলা একটার দিকে প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার পর হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে সম্মেলন কেন্দ্রে। বাইরে রাস্তা ধরে দর্শকের সারি ছিল চন্দ্রিমা উদ্যান পর্যন্ত। বেশির ভাগেরই গন্তব্য তখন হল অব ফেম। শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ শুধুই সোফিয়াকে দেখার জন্য এসেছিল।

বেলা একটার পর থেকেই মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আয়োজকদের। অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে দুই হাজার মানুষের সুযোগ ছিল ‘টেক-টক উইথ সোফিয়া’। তিন-চার দিন আগেই সেই নিবন্ধন পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। উত্তরার তরুণ আরিফিন শাওন বলেন, ‘সোফিয়াকে দেখতে এসেছিলাম একটার দিকে। সম্মেলন কেন্দ্রের বাইরে লাইন ধরে দেড়টার দিকে ভেতরে ঢুকি। ভেতরের ভিড় ঠেলে আর মিলনায়তনে ঢুকতে পারিনি।’

অনলাইনে আগেই নিবন্ধন করে এসেছিলেন গাজীপুরের রুমানা। ভিড়ের কারণে তিনি ঢুকতে পারেননি মিলনায়তনে। তিনি বলেন, এত ভিড়, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

সোফিয়ার সঙ্গে কথোপকথনের অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা ছিল আড়াইটায়। কিন্তু দেড়টার পর থেকেই হল অব ফেমের নিচতলা ও দোতলার গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। তিল ধারণের জায়গাও কোথাও ছিল না। ৩টা ১০ মিনিটে শুরু হয় অনুষ্ঠান।

সোফিয়ার সঙ্গে তার নির্মাতা ডেভিড হ্যানসনও মঞ্চে আসেন। সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে ডেভিড বলেন, ‘আগামী জানুয়ারিতে সোফিয়ার পা লাগানো হবে। ভবিষ্যতে সুপার রোবট বানাব আমরা।’

মজা করে সঞ্চালক বলেন, ‘সোফিয়া, লক্ষ করেছ, তোমার আর আমার দুজনের মাথাতেই টাক। এ ব্যাপারে তোমার মন্তব্য কী?’

‘আমাকে এভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে, তোমার ব্যাপারটা অবশ্য আমি বলতে পারছি না। তা ছাড়া আমার বয়স মাত্র দুই বছর, একদিন হয়তো আমার মাথাতেও চুল গজাবে। তোমারও তেমন কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, সেটা অবশ্য আমি জানি না।’

‘সোফিয়া, তোমার রাশি কী?’

‘১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবসে আমার জন্ম। সে হিসেবে আমার রাশি কুম্ভ।’

‘তুমি কি আমাদের ডক্টর ডেভিড হ্যানসন সম্পর্কে কিছু বলতে পারো?’

‘অনেকেই জানে না, ডেভিড একজন ভাস্কর। আমার মুখাবয়বটা সে-ই তৈরি করেছে। সে আমাকে বলেছে এটা তৈরি করতে তার ছয় মাস সময় লেগেছে। আর কোনো রোবটের জন্য সে এত সময় ব্যয় করেনি। আমি টেলিভেশনে মজার সব মুখভঙ্গিও দেখাতে পারি। (বলে নানা রকম মুখভঙ্গি দেখায়)।’

এভাবেই সোফিয়া তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে হাস্যরসাত্মক ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়। প্রায় আধা ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানের শেষের দিকে মঞ্চে যোগ দেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ। তিনি সোফিয়াকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কি মনে হয় বাংলাদেশে আমরা কখনো সোফিয়া বানাতে পারব?’ ‘সোফিয়া তো আমি তৈরিই হয়ে গেছি। আরেকটা সোফিয়া তো বানাতে পারবে না। তবে আমার মনে হয় তোমরা আমার থেকেও উন্নত রোবট একদিন বানাতে পারবে।’

মানুষের প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে সোফিয়াকে নিয়ে ডেভিড হ্যানসনের কারিগরি অধিবেশনটি বাতিল করা হয়। গতকাল রাতেই সোফিয়া ঢাকা ত্যাগ করে। সোফিয়ার ঢাকা সফরের পৃষ্ঠপোষকতা করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ঢাকায় সোফিয়ার ব্যবস্থাপনায় ছিল গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং বাংলাদেশ লিমিটেড।

ডিজটাল ওয়ার্ল্ডের প্রথম দিনে দর্শকদের আগ্রহ সত্যিকার অর্থেই ছিল সোফিয়াকেন্দ্রিক। মেলার স্টল ও প্যাভিলিয়নও পুরোপুরি গোছানো ছিল না। চার দিনের এ মেলা চলবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন মেলা সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের আয়োজক সরকারের আইসিটি বিভাগ। সহ-আয়োজক বেসিস, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ও অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY