এই বদভ্যাসটি বাদ দিতে হয় যে!

এই বদভ্যাসটি বাদ দিতে হয় যে!

127
0
SHARE

একটি জরুরি বিষয়। দিন যত যাচ্ছে, বিষয়টি ততই জরুরি হয়ে পড়ছে।
কিছু সমস্যা থাকে, আইন বা নীতিমালার দড়িতে বেঁধে সমাধানের কথা চিন্তা করতে হয়। কিন্তু আলোচ্য বিষয়টি এমনই যে সচেতনতার বড়ি ছাড়া অন্য কোনো ওষুধে এ ব্যামো সারবে বলে মনে হয় না।
খুলেই বলি। এই যে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়া, কানে ইয়ার ফোন-ব্লুটুথ লাগিয়ে ব্যস্ত সড়কে কিংবা রেললাইন দিয়ে হাঁটা, তারপর দুর্ঘটনায় পতিত হওয়া। আর তারপর মূল্যবান জীবন ও সম্পদের ক্ষয়।
কোনো একটি নির্দিষ্ট সড়ক বা জায়গার নামের অবতারণা এখানে অবান্তর। তবু শাহবাগ মোড়ের কথা উল্লেখ না করলে চলছে না। আপনি যেকোনো দিন যেকোনো সময় শাহবাগ মোড়ের যেকোনো একটি পাশে পাঁচটা মিনিট দাঁড়ান। তারপর দেখুন কী অসাধারণ সব দৃশ্য সেখানে! ট্রাফিক সিগন্যাল পড়ার তোয়াক্কা না করে হরদম ব্যস্ত মহাসড়ক পারাপার চলছে। আর তাদের বেশির ভাগেরই মুঠোফোনটা কানে। এদের অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল, বুয়েট, ইডেন কলেজ বা ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা বারডেমে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনেরা একই কাজ করছেন অবলীলায়। যেকোনো সময় নামতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল।
এই মুহূর্তে মনে পড়ছে তরুণ এক ছাত্রনেতার কথা। ছুটিতে বাড়ি গিয়ে ছিলেন ময়মনসিংহে। শীতের ভোরে হাঁটছিলেন রেলপথ ধরে। পরে তাঁর দুই টুকরো দেহ উদ্ধার হয়। তাজা রক্তে ভেজা ছিল স্লিপার, নুড়ি পাথর, কচি ঘাস। প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য দিয়েছেন, তরুণটির কানে হেডফোন ছিল। আর হুডিতে কান-মাথা এমনিতেই ঢাকা ছিল। ট্রেনের হুইসেল তাঁর আনমনা মনকে জাগাতে পারেনি।
সান্ত্বনা বসাককে কীভাবে ভুলি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের এই মেয়েকে চিৎকার করে সচেতন করার চেষ্টা করেছিলেন সহপাঠীরা। কিন্তু কিছুই কানে যায়নি ২৪ বছরের মেয়েটির। সান্ত্বনা ট্রেনে কাটা পড়েন। এ দৃশ্য চোখের সামনে দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না চারুকলার শিক্ষার্থীদের। চারুকলা অনুষদের পাশেই ঘটে যায় এ ঘটনা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওবায়দুল্লাহ (২৫) ছিলেন আমাদের অতি নিকট সহকর্মীর ভাগনে। ২০১৬ সালের ২০ মে কমলাপুরগামী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যান তিনি। তাঁর এক হাতে ছিল আইসক্রিম আর কানে ছিল মুঠোফোন। অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র ওবায়দুল্লাহর মৃত্যু হয় বহু মানুষের সামনে।
কেবল কি তরুণেরা? অনেক বয়সী মানুষও অবিবেচকের মতো মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছেন। মারাও পড়ছেন বেঘোরে।
পথচারীদের এই প্রবণতা নিয়ে কথা হচ্ছিল নারায়ণগঞ্জ-গুলিস্তান রুটের একজন বাসচালকের সঙ্গে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, যাঁরা ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হন, তাঁরা হর্ন দিলেও শোনেন না। জোরে ব্রেক মারতে হয়। এতে আবার যাত্রীরা শোরগোল তোলেন। আচমকা ব্রেক করায় পেছনের গাড়ি অনেক সময় ধাক্কা দিয়ে দেয়।

গাড়ি চালানো অবস্থায় চালকদের মুঠোফোনে কথা বলা বা থামাবে কে? গাড়ির বাইরে লেখা থাকে: ‘একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না’, আর ভেতরে লেখা থাকে: ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। সতর্ক হয়ে চলাচল করুন’। আর চালক সাহেব ফোনে কথা বলতে বলতে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছেন, ক্লাচ-ব্রেক-এক্সেলেটর নিয়ন্ত্রণ করছেন! মোটরসাইকেল চালাতে চালাতে ফেসবুকিং-চ্যাটিং না করলে যেন ফ্যাশনটা হয় না।
একটি আইন কিন্তু আছে। ২০০৭ সালে মোটরযান আইনের ১১৫ (বি) ধারার সংশোধন করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। এতে উল্লেখ রয়েছে, কোনো চালক দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মুঠোফোনে কথা বললে ৫০০ টাকা জরিমানা ও জেলদণ্ড দেওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের ট্রাফিক পুলিশ এ আইন প্রয়োগ করে, গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমরা এমন কোনো খবর পাই না।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম মুঠোফোন গ্রাহকদের সচেতন করতে নিজেই রাস্তায় নামবেন বলে গত বছর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর এ উদ্যোগ গণমাধ্যমের খবর হয়েছিল।
বিষয়টি নিয়ে তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলো গত শনিবার রাতে। তারানা হালিম বললেন, ‘যারা মুঠোফোন অপারেটর, তারা যদি এগিয়ে আসে, সবচেয়ে ভালো হয়। তারা তাদের সিএসআরের (করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা) অংশ হিসেবে কাজটা করুক না। তারা যেহেতু কোটি কোটি টাকা আয় করছে, কিছু অংশ এ কাজে ব্যয় করুক। আমরা যেকোনো সহযোগিতা দেব। তারা এই কাজ করলে অপারেটর ও গ্রাহকদের মধ্যে একধরনের সম্পর্ক তৈরি করবে।’
তারানা হালিম এ-ও বললেন, যদি অপারেটররা সাড়া না দেয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ কাজটা করবে। প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট মানুষের প্রয়োজনে এ কাজে যুক্ত হবে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী যেহেতু কথা দিয়েছেন, তিনি দ্রুত এ উদ্যোগ নেবেন বলে আমরা আশা করি এবং আমরা তাঁর এ উদ্যোগ দেখার অপেক্ষায় আছি।
শুরুতেই যা বলা হয়েছে, আইন থাক বা না থাক, কেউ সচেতন করুক বা করুক, যেহেতু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত মানুষের বিবেক, সেই বিবেক, বিচারবুদ্ধি আমরা কাজে লাগাই। এসব বদভ্যাস ধীরে ধীরে পরিত্যাগ করি। প্রিয়জনের জন্য হলেও নিজেদের জীবন বাঁচাই।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY