কেন এত সাপ ?

কেন এত সাপ ?

140
0
SHARE

রাজশাহী অঞ্চলে ইদানীং প্রায়ই গোখরা ও চন্দ্রবোড়া সাপ দেখা যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার রাজশাহীর দুটি বাড়িতে ১৫২টি গোখরা সাপ মারার ঘটনা সারা দেশে আলোচিত হয়েছে। সাপের ভয়ে রাজশাহীর অনেক জায়গায় গত বছর ধান কাটতে মাঠে নামার সাহস পাননি শ্রমিকেরা। তাঁদের ভয় ভাঙাতে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু গামবুট বিতরণ করে। সচেতনতা সৃষ্টিতে জনসংলাপেরও আয়োজন করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে সাপের নিরাপদ আবাস নষ্ট হচ্ছে। সেচের কারণে মাটি ভেজা এবং প্রচুর বৃক্ষরোপণের কারণে পরিবেশ ছায়াসুশীতল থাকছে। ভূ-প্রকৃতির এই পরিবর্তনের কারণে সাপ খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য আবাসিক এলাকায় চলে আসছে। এরা কাঁচা ঘরবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। বাড়ির ইঁদুরের গর্তে ডিম ফোটাচ্ছে।

পাশাপাশি পরপর কয়েক বছর বন্যার কারণে ‘চন্দ্রবোড়া’ বা ‘রাসেল ভাইপার’ নামের অতি বিষধর প্রজাতির সাপ ভারতীয় এলাকা থেকে প্রচুর পরিমাণে বাংলাদেশে ঢুকেছে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের মে মাসে, বিশেষ করে পদ্মা নদীর তীরবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চারটি, গোদাগাড়ীর ছয়টি ও পবা উপজেলার একটি গ্রামে চন্দ্রবোড়া সাপের উপদ্রব বেড়ে গিয়েছিল। তখন ওই এলাকায় প্রায় ১৫ জন সাপের কামড়ে মারা যায়। গত বছরের ১৩ মে গোদাগাড়ী উপজেলার কুমরপুরে ‘বারসিক’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাপের দংশন প্রতিরোধ, বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সচেতনতামূলক জনসংলাপের আয়োজন করে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার আফিনে পালপাড়া গ্রামের বোরহান বিশ্বাস স্নেইক রেসকিউ অ্যান্ড স্টাডি নামের একটি ক্লাব তৈরি করেছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পড়ুয়া প্রায় ৮৫ জন সদস্য রয়েছেন। বোরহান বিশ্বাস নটর ডেম কলেজের নেচার স্টাডি ক্লাবের সদস্য হয়ে একাধিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাঁরা অনেক জনসচেতনতামূলক সভা করে বিষাক্ত ও নির্বিষ সাপ শনাক্ত করা, সাপে কামড় দিলে কী করণীয় এসব জানিয়েছেন। সাপে কাটা প্রায় ২০০ রোগীকে তিনি হাসপাতালে পাঠিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্য প্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণকেন্দ্রের অধ্যাপক ও পরিচালক বহিরাঙ্গণ বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রাজশাহীতে যে সাপগুলো সম্প্রতি রান্নাঘরের গর্ত থেকে মারা হয়েছে, এগুলো ‘খইয়া গোখরা’, ‘খড়মপাইয়া গোখরা’, ‘চশমা গোখরা’ বা ‘বাইনো বিলেট কোবরা’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে তিন ধরনের গোখরার মধ্যে এই গোখরাই সবচেয়ে বেশি। অপর দুই ধরনের গোখরার মধ্যে ‘পদ্ম গোখরা’ বা ‘কিং কোবরা’ সাধারণত সুন্দরবন ও সিলেট, চট্টগ্রামের চিরসবুজ বনে বেশি দেখা যায়। অন্যটিকে বলে ‘গোক্ষুরা’ বা ‘মনোসিড কোবরা’, এটিও প্রায় সারা দেশে পাওয়া যায়। সাধারণত মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কোবরার প্রজনন মৌসুম। এই সময়ে এদের বেশি দেখা যায়। মাটির ঘরে, বিশেষ করে চুলার পাশে একটু উষ্ণ থাকে বলে রান্নাঘরের আশপাশে থাকতে পছন্দ করে। তা ছাড়া রান্নাঘর বা মাটির ঘরে ইঁদুরের গর্ত থাকে। এই গর্তগুলোয় সাপেরা প্রিয় খাদ্য ইঁদুর শিকার করতে আসে। পরে এসব গর্তেই তারা বাসা করে ডিম দেয়। তিনি বলেন, ‘চন্দ্রবোড়া’ বা ‘রাসেল ভাইপার’ও এখন রাজশাহী অঞ্চলে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। এই সাপ অত্যন্ত বিষধর এবং মহাবিপন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। বহু বছর পর ২০১২ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মনকশা এলাকায় প্রথম চন্দ্রবোড়া সাপ দেখা যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও সাপের বিষবিষয়ক গবেষক আবু রেজা বলেন, কৃষিজমিতে সেচ, বৃক্ষরোপণের কারণে এই এলাকায় সাপের বিচরণ বেড়েছে। পাশাপাশি বন্যার পানিতে ভারত থেকে ভেসে প্রচুর রাসেল ভাইপার রাজশাহীর চরাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল। পরে তারা জনবসতিতে ঢুকে পড়ে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক আজিজুল হক বলেন, এখন দেশে তৈরি কার্যকর ‘এন্টিভেনাম’ হাতের কাছেই পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য রাসেল ভাইপারের কামড়ে মৃত্যুর হার একেবারে কমে এসেছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY