খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে বন্যার্তরা

খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে বন্যার্তরা

18
0
SHARE

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট তীব্র। ত্রাণ পর্যাপ্ত নয়। জলাবদ্ধতায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তৃণভূমি তলিয়ে থাকায় গৃহপালিত পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বন্যার্তরা। বন্যার পানিতে ডুবে গত ২৪ ঘন্টায় কুড়িগ্রামে দুইজন ও গাইবান্ধায় ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে তিস্তা অববাহিকায় পানি কমতে শুরু করেছে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে ৭ উপজেলার ৪২ ইউনিয়নের ৫শ’ গ্রামের ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবল স্রোতে চিলমারী উপজেলার কাঁচকোলে ডানতীর রক্ষা প্রকল্পের ৫০ মিটার বাঁধ ও রৌমারী উপজেলার যাদুর চরে কত্তিমারী বাজার রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে নতুন করে ৫০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সরকারিভাবে স্বল্প পরিসরে ত্রাণ তত্পরতা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে কোন ত্রাণ তত্পরতা শুরু হয়নি।

বুধবার বিকেলের দিকে বন্যা কবলিত প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে পানিতে ডুবে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- চিলমারী উপজেলার শাখাহাতি গ্রামের সাইদুল ইসলামের মেয়ে লাইলী বেগম (২৮) ও সদর উপজেলার খামার হলোখানা গ্রামের পনির উদ্দিনের ছেলে হামিদুল হক (১৭)। অনেক পরিবার বাড়ি-ঘর ছেড়ে উচুঁ জায়গায় আশ্রয় নিলেও এসব এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ১৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জেলায় ১ হাজার হেক্টর জমির আউশ, পাট, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘন্টায় চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার এবং সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নাগেশ্বরীতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি না পেলেও কমেনি। অপরিবর্তিত রয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ বেড়েছে প্লাবিত দেড় শতাধিক গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি বৃহস্পতিবার আরো অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ও ঘাঘটের পানি ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া করতোয়া ও তিস্তার পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। গত ২৪ ঘন্টায় বন্যার পানিতে ডৃুবে তিন শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে বুধবার রাতে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানিতে স্বপ্না খাতুন (৭), বৃহস্পতিবার দুপুরে ফুলছড়ি উপজেলার কাবিলপুরের পিনহা খাতুন (৬) ও চর রতনপুর গ্রামের মিনহাজ মিয়া (৪) পানিতে ডুবে মারা গেছে।

বন্যাকবলিত সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৯ ইউনিয়নের ১৯০টি গ্রামের প্রায় সোয়া দুই লাখ বানভাসি মানুষ খাবারের সঙ্গে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কটে পড়েছে। গো খাদ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ উঠেছে। বন্যার পানিতে প্লাবিত ওই চার উপজেলার ১৩২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ২৪টি সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪ হাজার বন্যা কবলিত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

বন্যার সঙ্গে তীব্র হয়েছে নদী ভাঙন। গত চারদিনে সদরের কামারজানি, ফুলছড়ির ফজলুপুর ও উড়িয়া ইউনিয়নে দেড় শতাধিক পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে। উদাখালী ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, পানিবন্দি মানুষের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া ত্রাণ একেবারেই অপ্রতুল। এতো কম ত্রাণ সামগ্রী বন্যাদুর্গতদের মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তিনি সরকারের নিকট আরও বেশি ত্রাণের দাবি জানান।

অন্যদিকে নদনদী গুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গাইবান্ধার সাঘাটায় হাট ভরতখালী, ফুলছড়ি অংশে কাতলামারী, সিংড়িয়া ও রতনপুরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বাঁধের ঝুকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। জানা গেছে, জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি দেখার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া আগামী রবিবার গাইবান্ধায় সফর করবেন।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুর জেলায় বন্যার পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটেছে। যমুনা ও ব্রক্ষপুত্র নদের পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে গতকাল (বিকাল ৩টা নাগাদ) ২৪ ঘন্টায় ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ি ও জামালপুর সদরের তিনটি ইউনিয়নের সিংহভাগ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বিপুল সংখ্যাক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

এদিকে বন্যা কবলিত মানুষের মধ্যে এখন ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। কোথাও লোকজন দেখলেই দরিদ্র মানুষ তাদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন ত্রাণের জন্য। জেলা প্রশাসক আহাম্মেদ কবীর জানিয়েছেন, বন্যা কবলিত এলাকায় গতকাল ৫০ মে. টন চাল এবং নগদ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় ১৪০ মে. টন চাল এবং ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীতে গতকাল সকাল ৬টা থেকে পানি না বাড়লেও বিপদসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।  তবে গতকালও নতুন নতুন এলাকা বন্যা কবলিত হয়েছে। পাশাপাশি নদী ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকার দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, গতকাল সকাল ৬ হতে পানি বাড়েনি। ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কোন ঝুঁকি নেই।

বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলায় চরাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দি মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছেন।

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, উজানের ঢল কমে আসায় বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

ধুনট (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান,  উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির প্রবল স্রোত আঘাত হানায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ভুতবাড়ি গ্রামে বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার অংশে ভাঙনের ঝুকি এড়াতে বাঁশের তৈরি পাইলিং দিয়ে সেখানে বালু ভর্তি বস্তা ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সিলেট অফিস জানায়, গতকাল সারাদিন সিলেটে কোন বৃষ্টিপাত না হলেও বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বরং কোন কোন স্থানে সকালের চেয়ে সন্ধ্যায় পানি কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সুরমা-কুশিয়ারার পানি এখনো ৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বানভাসি মানুষেরা জানান, গতকাল যেভাবে রোদ উঠেছিল তাতে ভেবেছিলাম পানি কমবে। কিন্তু অনেক স্থান থেকেই পানি সরছেনা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় জানায়, বন্যা কবলিত সুরমা কুশিয়ারার তিনটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার এখনো উপরে। সন্ধ্যা ৬ টার রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায় সুরমা আববাহিকায় পানি সামান্য কমেছে বটে। কিন্তু কুশিয়ারা অববাহিকায় পানি বেড়েছে।

কানাইঘাটে সুরমা বিপদসীমার ৪৭ সে.মি. , অমলসিদে কুশিয়ারা ৫৫ সে.মি. ও শেওলায় ৪৯ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমার পানি বেড়েছে তবে বিপদসীমার নিচে আছে। দুর্গত এলাকায় ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। সরকারি বেসরকারি সহযোগিতায় ত্রাণ তত্পরতা চলছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম।

এবার দীর্ঘ বন্যার কবলে পড়ে সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের ১৭ উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ আর কষ্ট শেষ হচ্ছেনা। উপজেলাগুলো হচ্ছে—সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট। মৌলভীবাজার জেলার – বড়লেখা, জুরী, কুলাউড়া, রাজনগর, মৌলভীবাজার সদর এবং সুনামগঞ্জ জেলার – ছাতক, জগন্নাতপুর ও দোয়ারাবাজার। এসব উপজেলায় এখন বন্যার পানি থৈ-থৈ করছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY