ব্রাহমা লালনে লাখো টাকার লক্ষ্য

ব্রাহমা লালনে লাখো টাকার লক্ষ্য

155
0
SHARE

কুচকুচে কালো রং। দৃষ্টি বেশ তীক্ষ্ণ। অপরিচিত কাউকে দেখলে ফোঁস ফোঁস করে ওঠে। কিন্তু পরিচিত মানুষ কাছে পেলে রাগ কমে একেবারে শান্তশিষ্ট হয়ে যায়। শান্ত মেজাজে খড়-ভুসি মহানন্দে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। রোদ যেন শরীরে পিছলে পড়ে—এমন উজ্জ্বল রং। আর আকৃতিতে যেন সবার বড়। অথচ ওর বয়স মাত্র সাড়ে সাত মাস।

১৩ জুলাই সাভারের রাজাসনের দ্য হোয়াইট ডেইরি ফার্ম নামের একটি খামারে গরুটির দেখা মিলল। যে বয়সে ছোট, আকারে বড়। আর মাত্র বছর দেড়েক রাখতে পারলে প্রায় তিন লাখ টাকায় বিক্রি করা যাবে। মুনাফা হবে সোয়া লাখ টাকার মতো। তাই খামারটির কর্তাব্যক্তিরা দ্রুত লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। এ কথা জানা গেল খামারের তত্ত্বাবধায়ক মো. ইব্রাহিমের কাছ থেকে। তিনি বলেন, গরুটি ব্রাহমা জাতের। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এর শুক্রাণু সংগ্রহ করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার (সাভার ডেইরি ফার্ম) থেকে পাওয়া সেই শুক্রাণু একটি দেশি গাভির সঙ্গে সংকর করা হয় তাঁদের খামারে। এ বছরের জানুয়ারিতে বাছুরটি জন্ম নেয়।

কালো রঙের ব্রাহমা গরুটির বয়স মাত্র সাড়ে সাত মাস। কিন্তু এখনই ক্রেতারা দাম দিতে চাইছেন ৭০ হাজার টাকা।

ইব্রাহিম জানান, মাত্র সাত মাসে বাছুরটি উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট ছুঁয়ে গেছে। এক বছর বয়স হলে এর দুই দাঁত উঠতে পারে। তখন এটি কোরবানির উপযোগী হবে। তবে এবারের কোরবানি ঈদে নয়, আগামী বছর গরুটির ভালো দাম পাওয়া যাবে।

ভালো দামের জন্য কালো ষাঁড়ের যত্ন-আত্তিও চলছে একটু বেশি। কারণ সম্পর্কে ইব্রাহিম বলেন, সাভার ডেইরি ফার্ম থেকে বলেছে যত্ন নিতে। যত্ন নিয়ে নিয়মমতো খাবার দিলে এ ধরনের গরু তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। এখনই কালো গরুটির ওজন হয়ে গেছে প্রায় ২০০ কেজি। অনেকে গরুটি কিনতে চান। দাম দিতে চাইছেন ৭০ হাজার টাকা।

রাজাসনের আরও কয়েকটি খামারে ব্রাহমা জাতের বেশ কয়েকটি গরু জন্মেছে। বন্ধন ডেইরি ফার্মে একটি ফুটফুটে ব্রাহমা বাছুর দেখা গেল। ৬ জুলাই রাতে বাছুরটির জন্ম। ব্রাহমা বাছুরের প্রকল্পটি বেশ বড়সড় করতে শুরু করেছেন খামারের মালিক তাওহিদুল ইসলাম। এ জন্য ৪৮টি গরুর পালন–উপযোগী করে দুটি খোঁয়াড় নির্মাণের কাজ চলছে তাঁর খামারে। খামারে ওই বাছুরের বেশ দাপট। কান দুটি উঁচু করে পুরো খামারটি মাতিয়ে রেখেছে এটি। খামারে তিন মাস বয়সী বাছুরগুলোর মতো একই আকারের হয়ে গেছে মাত্র সাত দিন বয়সী ব্রাহমা শাবকটি। তবে মায়ের সঙ্গ একেবারে ছাড়তে চায় না। মায়ের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকে। সুযোগ পেলে মায়ের দুধ খেয়ে নেয়।

ব্রাহমা বাছুরটির বয়স কেবল সাত দিন। তবে ভীষণ ছটফটে।মায়ের দুধই বাছুরের প্রধান খাবার। এ কথা জানিয়ে তাওহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাহমা জাতের গরুর মাংস উৎপাদনের জন্য; তাই দুধের আশা না করাই ভালো। প্রতিদিন ওর মায়ের দুধ হয় নয় লিটার। আট লিটার দুধ বাছুরই খেয়ে ফেলে। এভাবে মায়ের দুধ তিন মাস দিতে হবে। এরপর থেকে খড়-ভুসি দিতে হবে। এর সঙ্গে কুঁড়া, ভুট্টা, ভুসি মিশিয়ে একটি খাবার দিতে হবে।
রাজাসনের খামারিরা জানান, একটি ব্রাহমা গরুর জন্য প্রতিদিন ২০০ টাকার খাবার দিতে হবে। তাহলে ঠিকমতো এই প্রজাতির গরু বেড়ে উঠতে পারবে।

১৫০ বছর পর ফিরল ব্রাহমা: ব্রাহমা জাতের গরুর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ। ১৮৬৫ সালে এর শুক্রাণু নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে প্রায় ১০০ বছরের বেশি সময় গবেষণা করে মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই জাতটি উন্নত করা হয়। তবে ব্রাহমা নিয়ে মার্কিন মুলুকে গবেষণা এখনো চলছে। কিন্তু মাংস উৎপাদনে ব্রাহমার শুক্রাণু সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। এসব দেশে নিজেদের আবহাওয়া উপযোগী করে ব্রাহমা উৎপাদন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিফ ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০৮ সালে ব্রাহমা উৎপাদন কর্মসূচি শুরু হয়। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ১১টি উপজেলায় তিন বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে এর কাজ করানো হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬০ হাজার মাত্রা শুক্রাণু আনা হয়। ফল ভালো আসায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রকল্পটি সংশোধন করে ৪৮টি জেলার ১৮৫টি উপজেলায় এর বিস্তৃতি হয়। প্রজননের জন্য দেশি গাভি নির্বাচন করতে হয়। এসব গাভির ভেতর ব্রাহমা ষাঁড়ের শুক্রাণু প্রয়োগ করানো হয়। বিফ ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জুন মাস পর্যন্ত ২৭ হাজারের বেশি গাভিকে কৃত্রিম প্রজনন করানো হয়েছে। এ পর্যন্ত সারা দেশে ব্রাহমা জাতের ১০ হাজার বাছুর জন্ম নিয়েছে।

একটি গরুর মাংস ২৫ মণ: ব্রাহমা গরুর মধ্যে ৫০ ভাগ দেশি গাভির ও ৫০ ভাগ ব্রাহমা ষাঁড়ের বৈশিষ্ট্য থাকে। জন্মের সময় ব্রাহমা বাছুরের ওজন থাকে ২৮ থেকে ৩৫ কেজি, যেখানে দেশি বাছুরের ওজন ১২ থেকে ১৪ কেজি। একটি পূর্ণবয়স্ক দেশি গরুর থেকে ২০০ থেকে ২৫০ কেজির বেশি মাংস পাওয়া যায় না। কিন্তু দুই বছর বয়সী একটি ব্রাহমার জাতের গরুর ওজন হবে ৮৫০ কেজি থেকে ১০০০ কেজির বেশি। নাড়িভুঁড়ি, চামড়া বাদ দিলে মাংস পাওয়া যাবে প্রায় ২৫ মণ। এ জন্য ব্রাহমা গরুর পরিচর্যা নিয়মমতো করাতে হবে।

এসব তথ্য জানা গেল বিফ ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক এস এম এ সামাদের কাছ থেকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাহমা গরু দেখতে একেবারে দেশি গরুর মতো। তবে আকৃতি বড়। এর কান দুটিও একটু দীর্ঘ হয়। মাংসের স্বাদ দেশি গরুর মতো। চর্বি কম থাকায় পুষ্টিগুণ বেশি থাকে। গরমের সময় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ব্রাহমা গরু সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতে পারে। বর্তমানে কোরবানি উপযোগী পাঁচ হাজার গরু প্রস্তুত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাহমা উৎপাদন দেশে গরুর মাংসের সংকট মেটাতে পারবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে গরুর মাংস বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ভেটেরিনারি অনুষদের অধ্যাপক সুলতান আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাহমা প্রজাতির গরু দ্রুত বেড়ে ওঠে। এর মাংস মানুষের শরীরের জন্য কোনো সমস্যা করবে না বা ক্ষতিকারক নয়। তবে এ জাতের গরুকে স্টেরয়েড বা হরমোন দেওয়া যাবে না। কৃমি হলে ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। স্বাভাবিক খাবার দিতে হবে। এর সঙ্গে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক পরিবেশে লালনপালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্রাহমা গরু মাংস উৎপাদনের জন্য, দুধ উৎপাদনের জন্য নয়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY