ভ্যান গঘের জগতে

ভ্যান গঘের জগতে

170
0
SHARE

হাতে সময় মাত্র ৩ ঘণ্টা। তা-ও সেটা বিদায়বেলায়। এই অল্প সময়ে আমস্টারডাম শহরের কী দেখব! এ চিন্তাতেই কেটেছিল আগের চারটি দিন।

জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনালের ‘বিশ্ব সম্মেলন’-এ যোগ দিতেই নেদারল্যান্ডসের এই শহরে আসা। ১০ নভেম্বর সেই ঘণ্টা তিনেকের সমাধান অবশ্য হয়েছিল। ঘুরে দেখার তালিকা থেকে প্রথম জায়গাটিতেই ছুটে গিয়েছিলাম। সেটি ছিল ওলন্দাজ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জাদুঘর। জাদুঘরের ঠিক সামনেই ট্রাম নামিয়ে দিল। সকাল সাড়ে নয়টা প্রবেশের সময় ছিল। কিছুটা আগেই পৌঁছেছিলাম, তাই একটু আশপাশে ঘুরে দেখার সুযোগ হলো। একটা জাদুঘর কতটা দৃষ্টিনন্দন হতে পারে, তা এখানে না এলে জানতাম না।

মূল ভবনে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল স্মারকের দোকান। কত কিছু যে তৈরি হতে পারে একজন চিত্রশিল্পীর কাজ নিয়ে, এই দোকানের জিনিসপত্র না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। ঘর সাজানোর জিনিস থেকে অফিসে ব্যবহার্য জিনিসপত্র—কী নেই সেখানে। তবে সব জিনিসই তৈরি হয়েছে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিত্রকর্মের আদলে।

ভ্যান গঘের প্রতিকৃতির সামনে লেখকপ্রথম তলা থেকে শুরু হয়েছে চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। বিষয়বস্তুর ওপর ভাগ করে প্রতিটি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে নির্দিষ্ট স্থানে। আরও স্থান পেয়েছে শিল্পীর কাছের মানুষের পরিচিতি, বিভিন্ন সময়ে লেখা চিঠি, এমনকি জাপানি এক ভক্তের আঁকা বেশ কিছু চিত্রকর্মও। জাপানি ভক্ত এই ছবিগুলো এঁকেছিলেন ভ্যান গঘের চিত্রকর্ম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এরই মধ্যে ৮ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখার সুযোগ হলো। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের পুরো জীবনী ফুটে উঠেছে এই প্রামাণ্যচিত্রে।

শিল্পীর পরিচিতি নিয়ে সাজানো হয়েছে জাদুঘরের প্রথম তলাটি। কোনো ব্যক্তি যদি বিশ্বখ্যাত এই চিত্রকর সম্পর্কে কিছু না-ও জানেন, জাদুঘরের ঢুকেই তিনি জেনে যাবেন বিস্তারিত। তাঁর পরিচিতির সঙ্গে রয়েছে আত্মপ্রতিকৃতি। এ এক অন্য অধ্যায়।

দ্বিতীয় তলায় মূলত স্থান পেয়েছে শিল্পীর পারিবারিক ইতিহাস। একজন চিত্রশিল্পীর ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে এক পাশে। আরও রয়েছে পারিবারিক পরিচিতি, ব্যক্তিগত ব্যবহার করা জিনিসপত্র, তুলির সংগ্রহ।

সান ফ্লাওয়ারএসব দেখতে দেখতে একসময় আপনিও হারিয়ে যাবেন ভ্যান গঘের জগতে। এর ওপরের তলাটি মূলত বিখ্যাত কিছু সংগ্রহের। যার একপাশে জায়গা পেয়েছে শিল্পীর ভক্তদের আঁকা কিছু ছবিও। মূল ছবিগুলো প্রতিটি বাঁধাই করা হয়েছে ব্যয়বহুল ফ্রেমে। সেটাও এক দেখার মতো জিনিস।

আরও আশ্চর্য করেছিল একটি যন্ত্র। যেটি হেডফোনের সঙ্গে যুক্ত। জাদুঘর ঘুরে দেখার সময় প্রত্যেক দর্শনার্থীকেই এটা দেওয়া হয়। কানে হেডফোন দিয়ে যন্ত্রটি নিয়ে প্রদর্শনীর সামনে দাঁড়ালে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলে যায় সে সংগ্রহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য। অনেকটা যান্ত্রিক গাইড।

সেদিন জাদুঘরে ঘুরতে ঘুরতে আমার সময়টুকু শেষ হয়ে এল। জাদুঘরের ভেতরে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া ছবি তোলা নিষেধ। তাই বেশির ভাগই স্মৃতির মনের মণিকোঠায় জমা রাখতে হয়েছে।

জাদুঘরে যে বিষয়টি অনেক বেশি নজরে এসেছে, তা হলো চিত্রকরের চিত্রকর্মকে বাঁচিয়ে রাখার আয়োজন। চিত্রবিন্যাসের আয়োজন থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধা—সবকিছুতেই নিখুঁত পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা। নিজের দেশেও অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের স্থাপনার স্বপ্ন নিয়ে জাদুঘর ছেড়েছিলাম।

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ

চিত্রশিল্পী

জন্ম: ৩০ মার্চ, ১৮৫৩, নেদারল্যান্ডস।

মৃত্যু: ২৯ জুলাই, ১৮৯০, ফ্রান্স।

কয়েকটি স্কুল বদলের পর একেবারেই স্কুল ছেড়েছিলেন ভিনসেন্ট, তবে সেটা কেন তা জানা যায়নি কখনো। ধারণা করা হয়, শিল্পের প্রতি তাঁর প্রথম ভালো লাগার শুরু লন্ডনে গিয়ে। কিন্তু চিত্রশিল্পী হওয়ার ইচ্ছা তখনো মনে পাকাপোক্ত হয়নি। উৎসাহের বীজ বুনে দিয়েছিলেন ভাই থিও ভ্যান গঘ। ১৮৮০ সালের দিকে শিল্পী হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ শুরু করেন তিনি। বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শিল্পী হওয়ার সাধনায় নেমেছিলেন ভিনসেন্ট। ঘরও ছেড়েছিলেন প্রেম আর শিল্পের টানেই।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY