সংকট কাটেনি, ৪৬৮৭ জনের হজযাত্রা অনিশ্চিত

সংকট কাটেনি, ৪৬৮৭ জনের হজযাত্রা অনিশ্চিত

142
0
SHARE

সৌদি আরবে বাড়িভাড়া, ভিসা না করাসহ বিভিন্ন কারণে হজযাত্রীদের পরিবহনে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা এখনো কাটেনি। বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, সংকট নিরসনে বাড়তি ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার পরও ৪ হাজার ৬৮৭ হজযাত্রী পরিবহনে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

হজযাত্রীর সংকটের কারণে গতকাল বুধবারও দুটি ফ্লাইট বাতিল করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ নিয়ে গত ১২ দিনে ২১টি হজ ফ্লাইট বাতিল হলো। আগামী ৩ দিনে আরও ১২টি ফ্লাইট বাতিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানাতে গতকাল বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোসাদ্দিক আহমেদ বিমানের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। তিনি বলেন, গতকাল পর্যন্ত ২১টি হজ ফ্লাইট বাতিলের কারণে ৯ হাজার ৮৮৭ যাত্রী পরিবহনের ক্ষমতা হারিয়েছে (ক্যাপাসিটি লস) বিমান। এতে বিমান ৪০ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বিমানের এমডি বলেন, হজযাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত ১৪টি স্লটের (হজ ফ্লাইট অবতরণের অনুমতি) ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সাতটি স্লট ব্যবহার করা যাবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৮৭ জনকে পরিবহনে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, ‘পরিস্থিতি বেশ কঠিন। তবে এখনো তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে হজযাত্রী সবাই যেতে পারবেন না—এ কথা এখনো বলা যাবে না। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে হজ ফ্লাইট চালু রাখাকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।’

এই সংকটের দায়ভার কার, এমন প্রশ্নের জবাবে বিমানের এমডি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না। তবে এর দায়ভার খুব সম্ভবত আমাদের না।’ তিনি বলেন, সমস্যাটা মূলত হজ এজেন্সিগুলোর বাড়িভাড়া–সংক্রান্ত। এজেন্সিগুলো সমন্বয়হীনভাবে বাড়ি ভাড়া করছে। তার জন্য ফ্লাইট বিপর্যয় ঘটছে।

এর আগের দিন মঙ্গলবার ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমান এই সংকটের জন্য হজ এজেন্সিগুলোকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, শিগগিরই সমস্যার সমাধান না করলে দায়ী এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) মহাসচিব শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘ভিসা-টিকিট আর বাড়িভাড়া–সংক্রান্ত জটিলতা একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাড়ি ভাড়া না হলে তো ভিসাও হয় না। বাড়িভাড়ার সমস্যাটা সমাধানে এজেন্সিগুলো কাজ করছে। ভিসা সমস্যাটা কমে এসেছে। আমরা এখন বিমানের ফ্লাইট নিয়ে উদ্বিগ্ন।’ তিনি বলেন, গতকাল ৮টি এজেন্সির প্রায় ১ হাজার ৪০০ হজযাত্রীর বাড়িভাড়া সমস্যা নিরসন করা হয়েছে। আরও ৮টি এজেন্সির প্রায় ১ হাজার ৪০০ হজযাত্রীর ভিসা ও বাড়িভাড়া জটিলতা এখনো বাকি আছে। দিন দুয়েকের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদী।

এদিকে হজ অফিসের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম গতকাল বলেন, ইতিমধ্যে প্রায় ৮৫ হাজার হজযাত্রীর ভিসা হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। এ মুহূর্তে প্রায় ৩৫ হাজার ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট তৈরি আছে। তিনি বলেন, ‘১৭ আগস্টের মধ্যে সৌদি দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার ডেডলাইন আছে। এর মধ্যেই সকল হজযাত্রীর ভিসার কাজ সম্পন্ন করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী।’

প্রতিবারই হজ এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে—এগুলোর বিরুদ্ধে হজ অফিস কোনো ব্যবস্থা নেয় না কেন? এ প্রশ্নের জবাবে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কড়া ভাষায় এজেন্সিগুলোকে চিঠি দিয়েছি। আমি নতুন এখানে, অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আমি মনে করি, এজেন্সিগুলো রেহাই পাবে না।’

হাজিদের উদ্বেগ

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উল্টো দিকে আশকোনায় অবস্থিত হজ ক্যাম্প। গতকাল বুধবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দিনভর বিভিন্ন জেলা থেকে হজযাত্রীরা আসছেন। ক্যাম্পজুড়ে হজযাত্রী, তাঁদের স্বজন ও এজেন্সির লোকজনের ব্যস্ততা। ক্যাম্পের নিচতলার মসজিদের সামনের ফাঁকা জায়গায় হজযাত্রীদের অনেকে ইহরাম পরছিলেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে গল্প করছিলেন কেউ, বিদায় নিচ্ছিলেন কেউ কেউ।

ফ্লাইট বাতিল হওয়া, ভিসা-টিকিট না পাওয়া, বাড়িভাড়া সমস্যা নিয়ে অনেকে হজযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী হজযাত্রী বলেন, ‘ভোর পাঁচটায় আমাদের বিমানটা ছাড়ার কথা। কখন ছাড়বে এখনো জানি না। শুরুতেই এমন দেরি কার ভালো লাগে?’

সাভারের মো. সাখাওয়াত হোসেন অভিযোগ করেন, ‘আমার ভিসাতে অন্যজনের ছবি লাগায়ে দিছে। এজেন্সি বলছে, দুই দিনের মধ্যে ঠিক করে দিবে। আজ ১৫ দিন হয়ে গেল, এখনো ঠিক করা হয় নাই।’ একই ছবি দেখা গেল সাভার থেকে হজ ক্যাম্পে আসা মো. ফায়েজ হোসেন খানের ভিসাতেও।

হজযাত্রীদের এসব সমস্যা সম্পর্কে হাবের মহাসচিব শাহাদাত হোসাইন বলেন, এ রকম সমস্যায় কোনো প্রস্তুতি থাকে না। ছবির সমস্যা দূতাবাসে পাঠানো হলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে ঠিক করে দেওয়ার কথা। তিনি বলেন, হজ এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ছোটখাটো সমস্যা থাকে। তখন তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা হয়। কখনো কখনো এজেন্সিগুলোকে শাস্তি বা জরিমানার ব্যবস্থাও করা হয়।

গত ২৪ জুলাই থেকে বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে। গত ১৭ দিনে ৫০ হাজার ২১৭ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে গিয়েছেন। গতকাল সৌদি এয়ারলাইনসের তিনটি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তিনটি ফ্লাইটে ২ হাজার ২৭১ জন ঢাকা ছেড়ে গেছেন।

চলতি বছর ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশ থেকে হজ পালন করতে সৌদি আরবে যাবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ২০০ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ লাখ ২২ হাজার ৯৯৮ জন হজে যাবেন।

অনিশ্চয়তায় ২৪ জন

রংপুর থেকে ২৪ জন হজ ক্যাম্পে এসেছেন ৬ আগস্ট। ওই দিন তাঁদের বলা হয়েছিল, দিন দুয়েকের মধ্যেই বিমানে চড়ে সৌদি যাবেন। কিন্তু এখনো তাঁরা ভিসাসহ পাসপোর্ট ও বিমানের টিকিট হাতে পাননি। তিন দিন ধরে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।

তাঁদের একজন ইসহাক আলী বলেন, তাঁরা ক্যাম্পে এসে জানলেন যে গাইড মো. শাহীনের সঙ্গে এজেন্সির টাকা লেনদেনে ঝামেলা হচ্ছে। তাঁদের গতকাল বলা হয়েছে, ঝামেলা মিটমাট হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গতবারও টাকা জমা দিয়েছিলাম। সিরিয়াল পাইনি বলে যেতে পারিনি। এবারও টাকা-পাসপোর্ট জমা দিছি। বলছে রাতে ভিসা-টিকিট দিবে। কাল (বৃহস্পতিবার) ফ্লাইট। দেখি কী হয়।’

রংপুরের এই দলে আছেন ব্যবসায়ী মো. সাব্বির হোসেন। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে তিন দিন আগে হজ ক্যাম্পে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ২৪ জন এখানে আছি। গাইড শুধু আশ্বাস দিচ্ছেন, আমাদের নিয়ে যাবেন। এজেন্সির সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরাও বলেছেন নিয়ে যাবেন।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY