সব মিডিয়ার সৃষ্টি!

সব মিডিয়ার সৃষ্টি!

192
0
SHARE

রস+আলো নামে যে ক্রোড়পত্রটি প্রতি সোমবারে বের করে প্রথম আলো, তাতে একটা প্রচ্ছদকাহিনি ছিল, ‘মাননীয় মেয়র, আসুন, মশা মারি।’ আমি গদ্যকার্টুন লিখে থাকি। কল্পনায় দেখতে পাই, এডিস মশারাও খুব চিন্তিত চিকুনগুনিয়া নিয়ে। কারণ, এর ভাইরাস তাদের রক্তে থাকে, এই ভাইরাসের কারণে তারা নানা রকমের নিন্দামন্দ শুনতে বাধ্য হচ্ছে। তাই এডিস মশারা তাদের মেয়রের কাছে গেছে—মশারা বলছে, ‘মাননীয় মেয়র, আসুন, আমরা মানুষ মারি।’ মশাদের মেয়র সে কথায় খুব কান দিচ্ছেন বলে মনে হয় না। কারণ, চিকুনগুনিয়ায় মানুষ মারা যায় কম, চিকুনগুনিয়া থেকে নিউমোনিয়া হওয়ায় এই দেশে অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ মারা গেছে। তবে প্রথম আলোয় খবর দেখলাম, একজন ভুক্তভোগী বলছেন, আমার শত্রুরও যেন চিকুনগুনিয়া না হয়। এই রকম ব্যথা! চিকুনগুনিয়ার জ্বর সেরে যায়, কিন্তু ব্যথা আর সারে না। ঘরে ঘরে লোকে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। একই বাড়িতে একাধিক রোগী। কোনো কোনো বাড়িতে সবারই হয়েছে।

রুহুল আবিদ আমেরিকার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক চিকিৎসক। হৃৎপিণ্ড নিয়ে গবেষণা করেন। আমি তাঁদের গবেষণাগারে ঢুকেওছিলাম। তিনি বাংলাদেশে চিকিৎসাজীবনের শুরুতে ছিলেন চা-বাগানে, চা-শ্রমিকদের জন্য হেলথ কার্ড চালু করে দারুণ ফল পেয়েছিলেন। এখন তিনি বাংলাদেশে আসেন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক আর রিকশাশ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার একটা নেটওয়ার্ক দাঁড় করানোর কাজে। সম্প্রতি এসেছিলেন সপরিবারে। ১৫ দিনের জন্য এসে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই পড়লেন চিকুনগুনিয়ায়। যাওয়ার আগে বারবার করে বলছিলেন, আপনারা করেনটা কী, চিকুনগুনিয়া নিয়ে কোনো প্রস্তুতি নেই, প্রতিক্রিয়া নেই, মশা মারার কোনো অভিযান নেই, প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ নেই। সবচেয়ে আশ্চর্য গণমাধ্যমে কোনো হইচই নেই। আমি এ ধরনের কথা শুনতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশের সব সমস্যার জন্য দায়ী গণমাধ্যম, প্রচলিত শব্দটা হলো ‘মিডিয়া’। বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়া হচ্ছে, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি। বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়া নিয়ে যথেষ্ট হইচই হচ্ছে না, এ জন্য গণমাধ্যম দায়ী।

বাংলাদেশে জলাবদ্ধতা হচ্ছে, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি।

বাংলাদেশে চালের দাম বেড়েছে, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি।

বাংলাদেশে পাহাড়ধস হচ্ছে, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি।

বাংলাদেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি।

বাংলাদেশে জেএমবি আছে, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি।

একটা টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে দেখলাম, ঢাকা শহরে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বাড়ির পানিতে এডিস মশার জীবাণু পাওয়া
গেছে। ২০ শতাংশ পাওয়া গেলেই সেটা মহামারি। আমাদের আছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। কাজেই সংজ্ঞানুযায়ী, এটা মহামারি। কিন্তু আমাদের মন্ত্রী-আমলারা বলছেন, এটা মহামারি নয়। মিডিয়া অকারণে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

বটে। যে মানুষটি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে, তাকে আমরা সান্ত্বনা দিতে পারি, আপনি নিশ্চিত থাকুন, এটা মহামারি নয়। দুটো প্যারাসিটামল খান আর একবার চিত হয়ে আরেকবার কাত হয়ে ঘুম দিন।

ঢাকায় জলজট, চট্টগ্রামে জলজট, রাজশাহীতে জলজট, খুলনায় জলজট। এটাও নিশ্চয়ই মিডিয়ারই সৃষ্টি।

ঢাকা শহরের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে। দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় নেই। আর যাকে বলে স্টর্ম স্যুয়ারেজ, ঢাকায় পাম্প দিয়ে পানি বের করে বাঁধের ওপারে নদীতে ফেলা হয়। একসঙ্গে বেশি বৃষ্টিপাত হলে পানি জমবেই। কারণ, সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ধরে কখনোই নকশা করা হয় না। কিন্তু এখন আমাদের যে সামর্থ্য, তাতে ৩০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমবে। দুই. আমাদের যে নিষ্কাশনব্যবস্থা আছে, তাও পলিথিন-ময়লা দিয়ে ভরাট হয়ে থাকে। এর বাইরে আমরা ঐতিহ্যগতভাবে নির্ভরশীল ছিলাম প্রাকৃতিক নিষ্কাশনে। বৃষ্টির পানি আগে আঙিনায়-মাঠে চুইয়ে ভেতরে যেত। এখন কোনো খোলা জায়গা নেই। বৃষ্টির পানি আগে খালে-বিলে-পুকুরে-ডোবায় জায়গা পেত। আমরা সেসব ভরে ফেলেছি। ঢাকায় ও ঢাকার আশপাশে যে বন্যা বা বৃষ্টির পানি জমার নিচু জায়গা ছিল, যা ভরাট করা আইনে নিষিদ্ধ, তা আমাদের ডেভেলপাররা ভরাট করে ফেলেছেন। এমনকি রাজউকও ভরাট করেছে। আর আমাদের নিষ্কাশনের জন্য যে খালগুলো ছিল, সেসবেরও অনেকগুলো বেদখল হয়ে গেছে, ভরাট হয়ে গেছে।

রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হলে যেকোনো শহরেই জলাবদ্ধতা হতে পারে। তবে সেই পানি নেমে যেতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। আর স্বাভাবিক বৃষ্টিতে জলজট হওয়ার কোনোই কারণ নেই, যদি সিস্টেম কাজ করে। আমাদের সিস্টেম কাজ করছে না। উত্তরের মেয়র আনিসুল হক বলেছেন, পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব ওয়াসার। খালগুলো কই গেল?

ঢাকার পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব চারটা কর্তৃপক্ষের। এক. ঢাকা ওয়াসা। দুই. পানি উন্নয়ন বোর্ড। তিন. রাজউক। চার. সিটি করপোরেশন। ছোট ছোট নর্দমার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। ঠেলাঠেলির ঘর, খোদা রক্ষা কর। সমন্বয়ের অভাব আমাদের বহু সমস্যার কারণ। আমরা ভোট দিয়ে স্থানীয় সরকার বানাব, কাজেই তাদের ধরতে পারি। কিন্তু রাজউক, ওয়াসা, পাউবোকে কে ধরবে?

আর আছে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকল্প গ্রহণ করা। একটা উদাহরণ দিই। র‍্যাংগস ভবন ভেঙে একটা নতুন রাস্তা বানানো হলো। রেলপথের ওপর দিয়ে নেওয়ার জন্য ফ্লাইওভারও হলো সেখানে। ওই রাস্তা আসলে উপকার করেছে, নাকি অপকার? আপনি তেজগাঁও থেকে এসে বিজয় সরণিতে পড়তে পারবেন না, যানজটের কারণে। অন্যদিকে আগে ওটা ছিল তিন রাস্তার মোড়, এখন হয়েছে চার রাস্তার মোড়। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে যানজট লেগেই থাকে। তাহলে ওই ফ্লাইওভারটা কি মোড়টা পার করে শেষ করা দরকার ছিল না? মগবাজার থেকে হাতিরঝিল হয়ে আরেকটা ফ্লাইওভার নামানো হয়েছে হোটেল সোনারগাঁওয়ের সামনে। ফলে এখন ফার্মগেট থেকে সোনারগাঁওয়ের দিকে আসতে যানজট গেছে বেড়ে।

আমরা যদি ঢাকা শহরের ম্যাপ নিয়ে সমন্বিত একটা যানজট মুক্তি মহাপরিকল্পনা করতে বসি, তাহলে এসব ফ্লাইওভারের অনেকগুলোই ভেঙে নতুন করে করতে হবে। উত্তরের মেয়র আনিসুল হক ঠিকই বলেছেন, জলাবদ্ধতার জন্য তাঁকে দায়ী করলে চলবে না। তিনি এও বলতে পারেন, যানজটের জন্যও তিনি দায়ী নন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে দুটো কথা বলা যায়। এক. পুরো ব্যবস্থা সমন্বয় করতে একটা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সমন্বয়ক বডি দরকার। বিচ্ছিন্নভাবে এখানে ফ্লাইওভার, ওখানে ওভারব্রিজ না বানিয়ে এ–সংক্রান্ত গবেষণা ও পরিকল্পনাগুলোকে হাতে নিয়ে দূরদর্শী মহাকর্মসূচি নেওয়া হোক। দুই. জলজট কিংবা যানজট বহু সংস্থার কাজ হতে পারে, মশা মারা কিন্তু সিটি করপোরেশনেরই কাজ। মাননীয় মেয়র, হাত লাগান। আসুন, মশা মারি।

মশা মারারও ঝক্কি অনেক। টেলিভিশনের খবরেই দেখলাম, একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, মশার ওষুধে মশারা সহনশীল হয়ে যায়। পুরোনো ওষুধে মশা আর মরে না। দুই. কেনার আগে যে নমুনা দেখানো হয়, সরবরাহের সময় তাই দেওয়া হয় কি না, এটাও পরীক্ষা করতে হবে। আর আমি বলি, ওষুধ ছিটানোর সময় ওষুধই ছিটানো হয়, নাকি পানি ছিটানো হয়, সেটাও দেখতে হবে। কারণ অল্প ওষুধ, বেশি পানি হলে মশারা সহনশীল হয়ে যাবে, ওই ওষুধ কার্যকারিতা হারাবে।

শুধু ঢাকা নয়, শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের নগরায়ণ, বাস্তুশাস্ত্র, যোগাযোগ, পানিব্যবস্থা, নিষ্কাশনব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে একটা দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা দরকার। আর দরকার সেই পরিকল্পনা অনুসারে সুসমন্বিত কর্মসূচি। আমাদের বড় বিমানবন্দর লাগবে, সুদক্ষ সমুদ্র ও নৌবন্দর লাগবে, প্রচুর এবং প্রচুর বিদ্যুৎ লাগবে, যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে, যার প্রধান উপাদান হবে নৌ আর রেলপথ। আমাদের নদীনালা, জলাশয়, বন, কৃষিজমি রক্ষার নীতি লাগবে। একটা মহা মহাপরিকল্পনা দরকার, তা প্রণয়ন করার জন্য দরকার টাস্কফোর্স। তাতে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের বড় ভূমিকা থাকবে। যদি ব্যাপারটাকে একটা রেলগাড়ির সঙ্গে তুলনা করি তাহলে বলা যায়, এই মহা মহাকর্মযজ্ঞে ইঞ্জিনের ভূমিকা পালন করবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। পরিকল্পনাটা হলো রেললাইন। বগি হলো দক্ষ প্রশাসন। দুর্নীতির বদলে দরকার হবে সুশাসনের জ্বালানি। এর প্রযুক্তি হলো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান। আর এর যাত্রী হলো জনগণ।

আমাদের দেশে কোনো প্রকল্পের পেছনে উদ্দেশ্য থাকে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা, জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে ব্যক্তিবিশেষের পকেট ভরা অর্থাৎ দুর্নীতি। আমরা আগে প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নিই, পরে এর সম্ভাব্যতা জরিপ করে ‘হ্যাঁ’ রিপোর্ট দিই। মানে সেতু বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই, খাল না থাকলে খাল কাটার জন্য আরেকটা প্রকল্প করি। সমস্যার সমাধানে টোটকা পদ্ধতি অবলম্বন করি। এবার দরকার একটা সামগ্রিক সুসমন্বিত পরিবেশবান্ধব দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা।

দেশে যদি চিকুনগুনিয়া আসে, মিডিয়া তা না জানালেও তা এসেছে, জানালেও এসেছে। মিডিয়া চিকুনগুনিয়া ছড়ায় না, খবর প্রকাশ করে মানুষকে সচেতন করে মাত্র। কোনো একটা খবর ছড়ালে সংবাদমাধ্যমকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা না করে খবরের কারণটাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা ভালো। মানুষ যখন দুহাতে মশা মারার চেষ্টা করছে, আমরা তখন বলতে পারি, ওরা হাততালি দিচ্ছে, তাতে আপনি খুশি হতে পারেন, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয় না।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY