সারাদেশে চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক বিস্তার

সারাদেশে চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক বিস্তার

106
0
SHARE
রাজধানীর মতো জেলা-উপজেলা, শহর ও গ্রাম অঞ্চলে আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস। ডেঙ্গুজ্বর বিষয়ে মানুষের সচেতনতা রয়েছে। তবে হঠাত্ শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, শরীরে উচ্চ তাপমাত্রাসহ নানা উপসর্গ নিয়ে আসা এ জ্বরে আগে কখনো ভুগেনি মানুষ। রোগীরা চিকিত্সকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন, এই জ্বরের ভাইরাসের নাম চিকুনগুনিয়া। এ জ্বরের ব্যাপকতা রোগী ও চিকিত্সকদের ভাবিয়ে তুলছে। জ্বর সেরে গেলেও দুই-তিন সপ্তাহ শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা থাকে। বিছানা থেকেও উঠা যায় না। রোগীদের নিত্য দিনের কাজ বন্ধ থাকে। শিশুদের ভোগান্তি আরো বেশি। অনেক শিশুর কথা বন্ধ থাকে, কাঁপুনি ও ব্যথায় চিত্কার করে প্রতিনিয়ত। জ্বর সেরে গেলেও শিশুদের শরীরের ব্যথা শেষ হয় না। গ্রামের মানুষ এর নাম দিয়েছে হাড়ভাঙা রোগ।
বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামপ্রতিক একটি জরিপে জানা যাচ্ছে, ঢাকার প্রায় প্রতি ১১ জনের একজন চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রায় একদশক ধরে বাংলাদেশে রোগটি দেখা দিলেও এবারের মতো প্রকোপ আগে দেখা যায়নি। এদিকে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। কেননা তাদেরকে দিনে এনে দিনে খেতে হয়। জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কাজে যেতে পারছে না নিম্ন আয়ের মানুষজন।
রাজধানীর আশপাশের গ্রামগুলোতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় চিকুনগুনিয়ার প্রভাব ঠেকাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসে ওষুধ ছিটানোর কর্মীসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিত্সা পরামর্শ প্রদান ও  মশক নিধন কার্যক্রম জরুরি তথ্য আদান প্রদানের সুবিধার্থে দক্ষিণ সিটির নগর ভবনে একটি তথ্য কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে এই কর্মসূচি নগরবাসীর চোখে পড়ে না। প্রতিদিনই ইত্তেফাকে ফোন দিয়ে নগরবাসী মশার উপদ্রব নিয়ে লিখতে অনুরোধ করেন। মশা নিধনে সিটি করপোরেশন ও পৌর করপোরেশন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এমন অভিযোগ আক্রান্তদের। তারা বলেন, ‘কোনো কোনো মেয়র কেবল কথাই বলে যাচ্ছেন। মশক নিধনে তারা পুরোটাই ব্যর্থ।’ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যক্রম শুরু করেছে। সভা-সেমিনারের মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন মসজিদে জুমার খুতবার আগে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ এবং প্রতিকার বিষয়ক বার্তা প্রচার করা হয়। এ ছাড়া দুই সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে ইতোমধ্যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমাদের সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল এলাকা থেকে সংবাদদাতারা গ্রামাঞ্চলে চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকরা জানান, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, আজিমপুর, আগারগাঁও, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, উত্তরা, গুলশান, বনানী, পুরান ঢাকা, গ্রীণরোড, কাঁঠালবাগান এসব এলাকা থেকে সর্বাধিক রোগী এসেছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কম-বেশি রোগী আসছে। মশকনিধন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন এডিস মশার প্রকোপ কেবল রাজধানীতেই দেখা গেছে। কিন্তু চিকুনগুনিয়ার জীবাণুবাহী এডিস এজিপ্টাই মশা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
কারণ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শেখ সালাহউদ্দিন জানান, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অনেক মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে গেছেন। তাদের মধ্যে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তরাও থাকতে পারেন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো মশা কামড় দিলে ওই মশাও এজিপ্টাই মশায় (চিকুনগুনিয়ার জীবাণুবাহী) পরিণত হয়। ওই মশা কাউকে কামড় দিলে তিনিও আক্রান্ত হবেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকাসহ সারাদেশে কত সংখ্যক মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত বা কতজনের মৃত্যু হয়েছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সমপ্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ইনস্টিটিউট অব এপিডিমিওলজি ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর) যৌথভাবে রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে জরিপ পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, ঢাকা শহরের সর্বত্রই কমবেশি এডিস এজিপ্টাই মশা ও মশার লার্ভা আছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমদাদুল ইসলাম বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর চাউর হওয়ার পর থেকেই তারা প্রতিদিন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালাচ্ছেন। জনগণকে সচেতন করতে র্যালি, লিফলেট বিতরণ, মাইকিংসহ নানা কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার অনেক পার্থক্য রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সাধারণত এত দীর্ঘ সময় ধরে শরীর ব্যথা বা অন্য লক্ষণগুলো থাকে না। যদিও জ্বর ভালো হয়ে গেলে কয়েকদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি লাগতে পারে। চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হলে কেউ মারা যায় না, শুধু দীর্ঘদিনের জন্য অনেকেই স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়া সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এক্ষেত্রে রোগীর রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া এন্টিবডি পরীক্ষা করে দেখা হয়। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে শুধু শুধু এই পরীক্ষা করার কোনো দরকার নাই, কেননা এতে চিকিত্সার ক্ষেত্রে কোনো লাভ হবে না।
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য ভাইরাস জ্বরের মতো এই রোগের নির্দিষ্ট কোনও চিকিত্সা নেই। এর চিকিত্সা মূলত রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময় করা। রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রচুর পানি বা অন্যান্য তরল খেতে দিতে হবে। চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। এর সঙ্গে সঙ্গে পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। তীব্র ব্যথার জন্য অন্য ভালো ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে এসপিরিন না দেওয়াই ভালো। ক্লোরোকুইন এই রোগের উপশম করে বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। রোগীকে আবার যেন মশা না কামড়ায় এজন্য তাকে মশারির ভেতরে রাখাই ভালো। কারণ আক্রান্ত রোগীকে মশায় কামড় দিয়ে কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড়ালে ঐ ব্যক্তিও এই রোগে আক্রান্ত হবেন। এ ছাড়া চিকুনগুনিয়া জ্বরের কোনো প্রতিষেধক নেই, কোনো ভ্যাক্সিন বা টিকাও নেই। তাই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এডিস মশা প্রতিরোধ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY