সড়কে, নৌকায় ত্রাণের অপেক্ষা

সড়কে, নৌকায় ত্রাণের অপেক্ষা

80
0
SHARE

তখন ভরদুপুর। ব্রহ্মপুত্র নদ ফুঁসে ওঠা পানি হুহু করে ঢুকছে ঘরের ভেতরে। সবাই ব্যতিব্যস্ত হাঁড়ি-পাতিল-চুলো, বিছানা-কাঁথা সামাল দিতে। তখনই প্রসব ব্যথা উঠেছিল আনোয়ারার।

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাডোবা গ্রামে আনোয়ারাদের বাড়ি। তাঁর প্রথম সন্তান হবে। ব্যথা বাড়ছে, ওদিকে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদের পানি। স্বামী মাহবুব গেছেন দিনমজুরি দিতে। বাড়িতে বয়স্ক কেবল তাঁর মা আকলিমা বেগম আর ভাবি চায়না। তাঁরাই মিলে যা করার করলেন। পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হলো আনোয়ারার। তবে ঠিক ভূমির ওপরে নয়। ঘরে তখন পায়ের পাতা ডোবা পানি। ছেলের জন্ম হলো চৌকির ওপরে। কোনোমতে রাত কাটিয়ে এক দিনের ছেলেকে নিয়ে নৌকায় করে ঘর ছাড়তে হলো আনোয়ারাদের। আশ্রয় নিতে হলো সড়কের ওপরে পলিথিনের ছাউনির ছাপরা বানিয়ে।

আনোয়ারাদের দক্ষিণ বালাডোবা গ্রামটি ধরলা আর ব্রহ্মপুত্র নদ যেখানে মিলেছে, তার পাশেই। সেখানে এখন দিগন্তজোড়া উথালপাতাল ঢেউ। গত বুধবার দুপুরে সেখানেই দেখা হলো সাত দিনের ছেলে কোলে আনোয়ারা আর তাঁর পরিবারের সঙ্গে। ছোট্ট ডিঙিতে করে তাঁরা সবাই এসেছেন বাড়ির খোঁজ নিতে। নৌকার দুই মাথায় আনোয়ারার বাবা ও ভাই লগি নিয়ে দাঁড়িয়ে। ভেতরে মা, ভাবি, ভাইপোসহ গাঁয়ের আরও কয়েকজন নারী। আনোয়ারার মন খারাপ। ছেলে আল আমিন কোল থেকে পানিতে পড়ে গিয়েছিল। তারপর থেকেই অবস্থা ভালো নয়। তাঁরা ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন মোল্লারহাটে চিকিৎসক দেখাতে। চিকিৎসক বলেছেন জন্ডিস হয়েছে। গায়ে জ্বরও আছে। কিছু ওষুধপথ্য নিয়ে ফিরতি পথে বাড়ির খোঁজ নিতে এসেছিলেন তাঁরা। কাতর কণ্ঠে আনোয়ারা বলছিলেন, ‘হামার ছাওয়াটার এলা কী হবে?’

লোকালয় বলে কিছু নেই

গত বুধবার সকাল থেকে বানে ডোবা উলিপুর উপজেলার কাতলা মারি, সাহেবের আলগা, চর সিতাই, বেগমগঞ্জ, ক্ষুদিরকুটির, দক্ষিণ ও উত্তর বালাডেবা, বুড়াবুড়ি, সরকারপাড়া, মিয়াজিপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ঘুরে দেখ গেল, দুর্গত মানুষের কষ্ট অবর্ণনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

লোকালয় বলে আর কিছু চেনা যায় না। যে দিকেই তাকানো যায়, কেবল থইথই পানি আর পানি। প্রবল স্রোতের টানে কচুরিপানার স্তূপ ভেসে যাচ্ছে। টিনের ঘরবাড়িগুলোর অধিকাংশই প্রায় জানালা অবধি ডুবে আছে। কোথাও কোথাও চালার কিনার ছোঁয়া পানি। মাঝে মাঝে পাট ও ধঞ্চেখেতের হাতখানেক ডগা আর বড় গাছগাছালির কাণ্ড পানিতে জেগে আছে। পানির ওপরে বিসদৃশভাবে জেগে থাকা গ্রামীণ সড়কের সেতুগুলোর রেলিং দেখে বোঝা যায় সেখানে রাস্তা ছিল। ঘরবাড়িগুলো পরিত্যক্ত। স্রোতের ছলছল শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ হঠাৎ একটি-দুটি ডিঙি বা ট্রলার সেই নীরবতা ভেঙে দিয়ে ভটভট শব্দ করে ছুটে যায়।

স্থবির জনজীবন
স্থবির হয়ে পড়েছে বানভাসি এলাকার জনজীবন। এই এলাকায় প্রবল বন্যার তোড় এসেছে ১০ আগস্ট। বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আইনুল ইসলাম জানালেন, এবার এত প্রবল বেগে ধরলার পানির তোড় এসে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে দিয়েছে যে, লোকে জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগই পায়নি। তিনি জানালেন, এই এলাকায় বন্যা নতুন নয়। কিন্তু বরাবরের চেয়ে এবারের বন্যার প্রধান পার্থক্যই হলো অতি দ্রুত পানি বেড়ে যাওয়া। বরাবর পানি ঘরের উঠানের নিচেই থাকে। কেবল ১৯৯৮ সালের বন্যায় এমন ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল। পানি বাড়তে থাকায় প্রথম দু-তিন দিনের ভেতরেই সবাই যে যা পেরেছেন মালামাল নিয়ে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাঁধ আর জেলার সঙ্গে সংযোগকারী আঞ্চলিক পাকা সড়কগুলোতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। নৌকা ছাড়া চলাচল করার উপায়ই নেই। আর মাঠে-ময়দানে কোনো কাজও নেই। কেউ কেউ ঠেলা জাল, ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরছেন। এ ছাড়া নারী-পুরুষ সবাই কর্মহীন। বসে আছেন ত্রাণের প্রতীক্ষায়। বাহির থেকে লোকজন গেলেই সাহায্যের আশায় সবাই এসে ভিড় করছেন।

নৌকায় ভাসমান সংসার
কেউ কেউ নৌকাতেই সংসার পেতেছেন। এমন এক ভাসমান সংসারের দেখা পাওয়া গেল ক্ষুদিরকুটির গ্রামে। নৌকার এক মাথায় লগি ঠেলছেন ৬০-৬২ বছরের আমির হামজা। তাঁর মেয়ে হাফিজা অন্য মাথায় মাটির চুলায় আধ ভেজা লাকড়ি দিয়ে ভাত চড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মা বঁটিতে কী যেন কাটাকুটি করছেন। কয়েকজন নারী ও শিশু গুটিসুটি মেরে আছে নৌকার মাঝামাঝি জায়গায়। আমির হামজা ও হাফিজা জানালেন, তাঁদের চারটি ঘর প্রায় ডুবে আছে। কাপড়চোপড় আর হাঁড়ি-পাতিল ছাড়া তেমন কিছু আনতে পারেননি। হাঁস-মুরগি ভেসে গেছে। ছাগলগুলো বাঁধের ওপর বেঁধে রেখেছেন। ওখানে গাদাগাদি করে থাকার চেয়ে নৌকায় থাকাতেই সুবিধা। তাই নৌকাতেই সপ্তাহখানেক থেকে তাঁরা বাঁধ আর বাড়ির মাঝে যাতায়াত করছেন। ত্রাণের কিছু চাল-চিড়া পেয়েছেন। তাই দিয়ে রান্না-খাওয়া চলছে।

সড়ক যেন গ্রাম

বিকেলে ধরলা সেতু থেকে যাত্রাপুর সড়কে গিয়ে মনে হলো সড়কটিই একটি বিশাল গ্রামে পরিণত হয়েছে। এক পাশ দিয়ে গরু, ছাগল, ঘোড়া বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা। ওপরে পলিথিনের ছাউনি। অন্য পাশে বস্তির মতো টানা পলিথিনের ছাপরা। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে লোকে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। নানা বয়সের হাজার হাজার মানুষ। সেখানেই কেউ রান্না করছেন, কেউ ছাউনি মেরামত করছেন। কারও ছেলেমেয়ে তারস্বরে কাঁদছে, কেউ ত্রাণ নিয়ে আসছেন। কেউ গবাদিপশুর জন্য খড় কেটে কেটে টিনের পাত্রে ভরছেন, কেউবা বাঁশের আড়ায় মেলে দেওয়া ভেজা পাট উল্টেপাল্টে দিচ্ছেন। কোনো যানবাহন চলছে না। পাঁচগাছি উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে সড়ক ভেঙে স্রোত ছুটছে।

সড়ক ধরে আরজিভোগডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, স্কুলের মাঠে ত্রাণের জন্য শত শত লোক লাইন দিয়ে আছেন। এখানে ৪৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেওয়া হবে। ত্রাণের জন্য খুবই গরিবদের নামের তালিকা করা হয়েছে। স্থানীয় পাঁচগাছি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আনোয়ার হোসেন জানালেন, ১৫০ জনকে ত্রাণ দেওয়া হবে। কিন্তু হাজির হয়েছেন কয়েক হাজার নরনারী। তাঁরা যাকে পাচ্ছিলেন তাঁকেই ধরে মিনতি করছিলেন ত্রাণের জন্য, তাঁদের নাম লিখে নিতে।

তদারককারী বিজিবির নায়েক সুবেদার মতিউর রহমান বললেন, তাঁদের সিও লে. কর্নেল আওয়াল উদ্দিন আহমেদ ত্রাণ বিতরণ করবেন। গত তিন দিন ধরে তাঁরা অতিশয় দরিদ্রদের মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় জনপ্রতি সাত কেজি চাল, এক কেজি করে চিড়া, ডাল, তেল, দেড় লিটার পানি, আধা কেজি লবণ ও ২৫০ গ্রাম গুড় বিতরণ করছেন।

বিশ্বাস করেন রাতে ঘুমাই না

যাত্রাপুর সড়ক ধরে আরও কিছু দূর যাওয়ার পর দেখা হলো মুন্নি চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএসের শিক্ষা কার্যক্রমের এক স্কুলশিক্ষক। দুই ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে সংসার। শুলকুর বাজারে তাঁদের বাড়ি। বানেডোবা সেই বাড়ি ছেড়ে এসে এখন পলিথিনের ছাপরা দিয়ে মাথা গুঁজেছেন পথের পাশে। খাট, সোফা সব ডুবে গেছে। একটি টেবিল আনতে পেরেছেন। তার ওপর পোঁটলা বাঁধা বিভিন্ন জিনিসপত্র আর থালাবাসন। পাশের খানিকটা জায়গায় চটের ওপর পলিথিন বিছিয়ে বিছানার মতো করা। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্না আটকে রাখতে পারলেন না। বললেন, এভাবে রাস্তার ওপর থাকতে হবে, কোনো দিন ভাবতে পারেননি। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাবেন, সে উপায়ও নেই। তাঁদের বাড়িও ডুবে গেছে। প্রচণ্ড মশা। চারপাশে কেমন ভ্যাপসা গন্ধ। এর মধ্যেই কোনোরকমে রান্না করে খাওয়া। গোসলের ব্যবস্থা নেই। শৌচকর্মের খুবই দুর্গতি। বিশেষ করে নারীদের।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকে কয়েক দিন হলো ইউনিসেফের ছাপ দেওয়া মোটা প্লাস্টিক সিট দিয়ে ঘিরে একটি করে শৌচাগার করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় লম্বা লাইন। খাওয়ার পানির খুব সংকট। প্রায় দেড় দুই কিলোমিটার পরপর একটি করে নলকূপ বসানো হয়েছে। লোকে সেখান থেকে পানি আনছেন।

চোখ মুছতে মুছতে মুন্নি বললেন, ‘বিশ্বাস করেন, রাতে ঘুম হয় না। ভাবি নাই এমন দুর্ভোগও কপালে লেখা ছিল।’

পানি আর বাড়ছে না। তবে নামছে খুব ধীরে। দুর্ভোগ সহজে লাঘব হবে তেমন লক্ষণ নেই।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY