ইউরোপের পর মধ্যপ্রাচ্যে করোনার দ্রুততর হানা

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে করোনাভাইরাসে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্তৃপক্ষ বিধিনিষেধ শিথিলের পর নতুন করে লকডাউন জারি করতে বাধ্য হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, করোনা মহামারি যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে দ্রুত গতি পাচ্ছে, এটি তারই প্রমাণ।  

খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সংক্রমণ ঠেকাতে জারি করা লকডাউন ও বিধিনিষেধ শিথিল করছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় দফা করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতি পুনরায় চালু করার ঝুঁকি সামনে নিয়ে আসছে। বিশেষ করে জনবহুল এসব দেশে দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। ব্রাজিল, ভারত ও নাইজেরিয়ার মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশগুলো ইতোমধ্যে বিধিনিষেধ শিথিল করার ফলে সংক্রমণ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে।

রমজান ও ঈদের সময় কারফিউ শিথিল করার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বেড়েছে সংক্রমণ। অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশ সংক্রমণের শুরুতেই লকডাউন ও কারফিউয়ের মতো বিধিনিষেধ জারির ফলে আক্রান্তের সংখ্যা কম ছিল। স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার যখন এমন পদক্ষেপ আরও বেশি প্রয়োজনীয় ছিল তখন অনেক দেশই তা শিথিল করে ফলে।

সৌদি আরবে করোনার বিস্তৃতির ফলে পুরো বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা এবারের হজ পালন নিয়ে এখনও সংশয়ে রয়েছেন। প্রতি বছর হজে ১৫ লাখ মানুষ মক্কা ও মদিনায় জড়ো হন। এবার তা জুলাইয়ের শেষ দিকে আয়োজনের কথা রয়েছে। তবে সৌদি কর্মকর্তারা এখনও হজ আয়োজন বা বাতিলের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি। এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অন্তত সাতটি দেশ জানিয়েছে, এবার হজে কোনও নাগরিক পাঠাবে না তারা। প্রতি বছর এই দেশগুলো থেকে আড়াই লাখের বেশি মুসল্লি হজে অংশগ্রহণ করেন।

রমজানের শেষ দিকে সৌদি আরবে নতুন আক্রান্ত, গুরুতর রোগী ও ভাইরাস সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা লাফ দিয়ে বাড়তে শুরু করে। একই সময়ে কর্তৃপক্ষ জনস্বাস্থ্য বিধি শিথিল করায় সংক্রমণ দ্রুততর হয়েছে। দেশটির নাগরিকদের অনেকেই বয়স্ক এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত থাকায় শুরুর দিকে সংক্রমণের তুলনায় পরিস্থিতি জটিল। সৌদি আরবে শুরুর দিকে আক্রান্তদের মধ্যে ছিলেন বিদেশি শ্রমিকরা, যারা ঘনবসতিপূর্ণ ডরমিটরিতে বাস করতেন।

সৌদি আরবের করোনা মোকাবিলায় জড়িত সিনিয়র এপিডেমিওলজিস্ট ড. সামি আলমুদারা বলেন, করোনাভাইরাস এখন সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে, বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে গেছে। এমনকি আবারও যদি লকডাউন জারি করা হয়, তবু তা ছড়াবে।

তেল সমৃদ্ধ দেশটির মোট আক্রান্তের এক-চতুর্থাংশের বেশি এবং প্রায় অর্ধেক মৃত্যু হয়েছে গত দুই সপ্তাহে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন বেশি আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন।

উপকূলীয় শহর জেদ্দাতে ইনটেনসিভ কেয়ারের সবগুলো বিছানা রোগীতে পূর্ণ। শিথিল করার কয়েকদিনের মাথায় কর্তৃপক্ষ বিধিনিষেধ পুনরায় জারি করেছে। শহরটির মসজিদ, রেস্তোরাঁ ও কার্যালয় বন্ধ করা হয়েছে এবং কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশঙ্কা করছে, রাজধানী রিয়াদের অবস্থাও একই রকম হতে পারে।

সৌদি আরবে এই সপ্তাহে প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি নতুন আক্রান্ত ও ৩৩ জনের বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি ও মৃত্যু হয়েছে ৮৫৭ জনের। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরান থেকে ইরাকে, মিসর থেকে ইসরায়েলে বাড়ছে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা।

সৌদি আরবে উপ-জন-স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. হানি জোখডার স্বীকার করেছেন মহামারি চূড়ায় পৌঁছার আগেই সরকার বিধিনিষেধ শিথিল করে ফেলেছে। কিন্তু তিনি বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে গুরুতর রোগীর সংখ্যায় তাৎপর্যপূর্ণ কোনও পরিবর্তন আসেনি।

তবে প্রকাশিত করোনা পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে এপিডেমিওলজিস্টরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার সংক্রমণের উৎস শনাক্ত করতে যথেষ্ট তৎপরতা দেখাতে পারেনি। যেসব দেশ সফলভাবে মহামারি মোকাবিলা করতে পেরেছে সেগুলোর তুলনায় এই দেশগুলোতে প্রত্যেক আক্রান্তের বিপরীতে পরীক্ষার সংখ্যা অনেক কম।

জন্স হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক জেনিফার নুজ্জো মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয় যে, ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে দৈনিক সংক্রমণ কমিয়ে আনা। তিনি বলেন, আক্রান্তদের খুঁজে পেতে ও তাদের বিচ্ছিন্ন করতে তারা যথেষ্ট কর্মতৎপর না। এমনকি আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতেও উদ্যোগ কম। তারা হয়ত আক্রান্তদের পাচ্ছে, কিন্তু এর বাইরেও অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছেন যারা শনাক্ত হয়নি।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি-ভিত্তিক আওয়ারওয়ার্ল্ডইনডাটা ডট ওআরজি’র পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রত্যেক আক্রান্তের বিপরীতে পরীক্ষার সংখ্যা সৌদি আরবে ৭.৯২, বাহরাইনে ১৩.১৫। বিশ্বে প্রতি দশ লাখ জনসংখ্যায় তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা সর্বাধিক থাকা দেশগুলোর একটি কাতারে আরও কম পরীক্ষা করা হচ্ছে। দেশটিতে আক্রান্তের বিপরীতে পরীক্ষার হার ২.৮৯। তবে মার্চের শেষ দিকে এই সংখ্যা ছিল ৭৪ এর কাছাকাছি।

অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও আইসল্যান্ডে মতো যেসব দেশ দৈনিক সংক্রমণ কমিয়ে আনতে ও অল্প রাখতে পেরেছে সেগুলোতে প্রত্যেক আক্রান্তের বিপরীতে পরীক্ষার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রত্যেক আক্রান্তের বিপরীতে অস্ট্রেলিয়াতে পরীক্ষার সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩০০।

সৌদি উপ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশটিতে প্রায় ১০ লাখ পরীক্ষা করা হয়েছে। মূলত তা করা হয়েছে, ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের।। ফলে দেশটিতে আক্রান্ত শনাক্তের হার বেশি ও মৃতের হার কম।

কাতার সরকার জানিয়েছে, দেশটি নাগরিক ও বিদেশি শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ দিয়েছে। এছাড়া সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক ও জনসমাগম স্থল বন্ধ করা হয়েছে। দেশটি বলেছে, প্রত্যেকের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় হটস্পট ইরান দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসাতে এপ্রিলের শেষ দিকে অর্থনীতি সচল করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এই মাসের শুরুতে দৈনিক নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্চের শেষ দিকে সংক্রমণের যে চূড়ায় অবস্থান করছিল দেশটি সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

আরব দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল মিসর জানিয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদি লকডাউনের অর্থনৈতিক ক্ষতি বহন করার সামর্থ্য তাদের নেই। তারা রাতের কারফিউয়ের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং রমজানে তা শিথিল করা হয়। এর ফলে দেশটিতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

মিসরের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, সরকারি আক্রান্ত ৩৮ হাজার ২৮৪ জনের চেয়ে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচগুণ বেশি হতে পারে। সাম্প্রতিক সংক্রমণ বৃদ্ধির পরও দেশটি রাতের কারফিউ তুলে নিচ্ছে এবং ১ জুলাই থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করতে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিনের সংঘাত ও দুর্বল শাসন ব্যবস্থার কারণে ইরাকের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনিতেই ভঙ্গুর। গত সপ্তাহে দেশটিতে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর ফলে আক্রান্ত শনাক্তও বেড়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা বলছেন, জনগণ গ্লাভস ও মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন না। দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় নেতা সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় শনিবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করেছে ইরাক।

দুই মাস বন্ধ থাকার পর মে মাসে স্কুল চালু হওয়ার পর ইসরায়েলে গত দুই সপ্তাহে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন মাস্ক পরা ও করোনা বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কঠোর হওয়ার জন্য। এছাড়া চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহ, রেল ও গ্যালারি পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা থেকেও সরে এসেছে দেশটি।

সৌদি আরবের বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা গিয়েছে জনসমাগম এড়াতে এবছরের হজ সীমিত মাত্রায় আয়োজন করা হবে নাকি একেবারেই বাতিল করা হবে।

ড. আলমুদারা বলেন, এটি খুবই ঝুঁকির। হজের পর দেশে ও বিশ্বে ভাইরাসের নতুন বিস্তৃতি হয়ত শুরু হতে পারে। আমরা চাই না এই বিস্তৃতির কারণ হতে।

Add Comment