তীব্র বিক্ষোভ, অর্থনৈতিক সংকট এবং বহিরাগত চাপ সত্ত্বেও ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোতে এখনো দৃশ্যমান কোনো ভাঙন দেখা যাচ্ছে না। দেশটির শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীগুলো—বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস ও বাসিজ প্যারামিলিটারি ইউনিট—সরকারের টিকে থাকার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে, যা ইরানকে বিশ্বের অন্যতম প্রতিরোধক্ষম সরকারে পরিণত করেছে।
সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে চলমান আন্দোলনের সহিংস দমনের প্রেক্ষিতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন। এর আগে, ২০২৫ সালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তেহরানের পারমাণবিক প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। এসব ঘটনার পটভূমিতে বর্তমানে ইরান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনীতিক, সরকারি সূত্র ও বিশ্লেষকেরা জানান, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বিদ্রোহ না হলে বা পদত্যাগ না ঘটলে, ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হলেও টিকে থাকবে। এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলমান বিক্ষোভে প্রায় ২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তিনি মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন ‘সন্ত্রাসী’ পরিচয়ে পরিচিত কিছু গোষ্ঠীকে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর আগে ৬০০ মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছিল।
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীতে প্রায় ১০ লাখ কর্মী রয়েছে, যাদের বাইরের চাপ বা হুমকির মুখেও ভেঙে ফেলা অত্যন্ত কঠিন বলে মন্তব্য করেন ইরানি-মার্কিন বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর। তার মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে সক্রিয় থাকা দরকার, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদত্যাগ জরুরি।
পল সালেম (মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট) বলেন, ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনি অতীতেও বিক্ষোভ দমন করেছেন। এটি ২০০৯ সালের পর থেকে পঞ্চম বড় আন্দোলন, যা একদিকে সরকারের স্থিতিশীলতা, অন্যদিকে দমনমূলক সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সরকার টিকে থাকলেও ইরান গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে আছে। অর্থনীতি সংকুচিত, পুনরুদ্ধারের পথ স্পষ্ট নয়, পারমাণবিক কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত, এবং আঞ্চলিক মিত্রতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়ে সরাসরি ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে। সরকার ব্যাপকভাবে সহিংস দমন শুরু করেছে, যার ফলে বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মানবাধিকার সংস্থা এইআরএএনএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের হুমকি ইরানের পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা এনেছে। অনেকে বলছেন, তিনি ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ প্রয়োগের চিন্তায় রয়েছেন—যেখানে শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাষ্ট্র কাঠামো বজায় থাকবে। তবে মার্কিন কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক হস্তক্ষেপ হলে ইরানে নৃতাত্ত্বিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও প্রকট হতে পারে, বিশেষ করে কুর্দ ও বালুচ অধ্যুষিত অঞ্চলে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাকোভস্কি বলেন, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি নয়, বরং তা হবে লক্ষ্যভিত্তিক ও দ্রুত। সম্ভাব্য কৌশলের মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপথে চাপ, লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক বা সাইবার হামলা, এবং প্রযুক্তি সহায়তা (যেমন স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ) ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করা।
ম্যাকোভস্কি আরও বলেন, ট্রাম্প মাঝে মাঝে হুমকি দিয়ে সিদ্ধান্তে দেরি করেন, আবার কখনো প্রতিপক্ষকে চমকে দেন। ইরানের বিষয়ে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।







