Home Bangladesh এবার বন্যায় ৭৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে

এবার বন্যায় ৭৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে

106
0

তিন দিন ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে বন্যার পানি নামছে। কিন্তু এর মধ্যেই উজানে ভারতীয় অংশে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আর তা ঢল হয়ে আগামী দুই দিনের মধ্যে দেশে আরেক দফা বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে এমন পূর্বাভাসই দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চল এবং সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি কাল থেকেই অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

জাতিসংঘের নেতৃত্বে উন্নয়ন সংস্থাগুলো বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে একটি যৌথ জরিপ করেছে। গত শনিবার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যার প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ২১ জেলার ৭৫ লাখ ৩০ হাজার মানুষ চলতি বন্যার কবলে পড়তে পারে। এদের মধ্যে ৩৮ লাখই নারী। পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত হতে পারে ২ হাজার ৮৩৩ জন।

দেশের কোন এলাকার মানুষ কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তার একটি ধারণাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রাজধানী ঢাকার মানুষ। এই শহরের ১৬ লাখ ৪৮ হাজারমানুষ বন্যার কবলে পড়তে পারে। এরপরই রয়েছে বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলা। এসব জেলায় তিন লাখের ওপরে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জানতে চাইলে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাক্টরস বাংলাদেশের (নাহাব) উপদেষ্টা ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ আবদুল লতিফ  বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আসন্ন ঈদের আগে বন্যার পানি নামছে না। এখন বন্যার্তরা যে খাদ্য ও ত্রাণসহায়তা পাচ্ছে, ঈদের ছুটির মধ্যে তা পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, সরকারি অফিস ও স্বেচ্ছাসেবকদের বড় অংশ তখন ছুটিতে থাকবে। তাই ওই সময়ের কথা চিন্তা করে বন্যাপ্রবণ এলাকায় ত্রাণের মজুত করতে হবে।

এদিকে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বন্যার্তদের সহযোগিতায় একটি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এ সপ্তাহের মধ্যে এই সংস্থাগুলোকে নিয়ে সরকারের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় উন্নয়ন সংস্থাগুলো সামনের দিনে কী ধরনের কাজ করবে, তা আলোচনা হবে এ বৈঠকে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আতিকুল হক  বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত সরকার একাই কাজ করছে। উন্নয়ন সংস্থাগুলো কীভাবে এ কাজে এগিয়ে আসতে পারে, তা নিয়ে আমরা দ্রুত বৈঠকে বসছি। দরকার হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হবে।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, বর্তমানে দেশের ১৮ জেলায় বন্যার পানি আছে। উজানে ও দেশের ভেতরে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় আগামীকাল থেকে এসব জেলার বন্যা পরিস্থিতির তো অবনতি হবেই, একই সঙ্গে আরও কয়েকটি নতুন জেলার পানি প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকা, পদ্মা ও হাওর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি সবচেয়ে বেশি হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূইয়া বলেন, আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পানির যে ঢল আসছে, তাতে দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চল এবং হাওর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

বাংলাদেশের বন্যাবিষয়ক জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আগামী ১০ দিনে পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। এতে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ওই পানি বাংলাদেশে থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত চলমান বন্যা ১৯৮৮ সালের মতো ক্ষতিকর হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বন্যার পানি থাকলে তা হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বর্তমানে ২৪ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮১৬টি পরিবার অর্থাৎ প্রায় ২৮ লাখ মানুষের বাড়িঘর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের জন্য ১ হাজার ১০০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে সমাজের দুর্বল অংশের জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতির একটি সম্ভাব্য হিসাব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এই বন্যায় ১১ হাজার প্রতিবন্ধী, ২৪ হাজার নবজাতক, ২৪ লাখ ৮০ হাজার শিশু-কিশোর (৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী), ৬১ হাজার বয়স্ক মানুষ ও ২২ হাজার গর্ভবতী নারী ক্ষতির মুখে পড়বে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত  বলেন, ফি বছর বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোর বেশির ভাগই দারিদ্র্যের দিক থেকে সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা এলাকা। এসব জেলার মানুষেরা বন্যায় একবার ক্ষতির মুখে পড়লে তা পূরণ করার সামর্থ্য তাদের থাকে না। এ জন্য বন্যার্ত মানুষের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা এখন থেকেই এমনভাবে করতে হবে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার পর তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here