করোনা প্রতিরোধে টিকার যুগে বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রতিরোধে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার কার্যকারীতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এসব বিষয় মাথায় রেখে বুধবার বিকেলে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এ টিকার কার্যক্রম শুরু করবে সরকার।

দেশের হয়ে প্রথম করোনার টিকাটি নেবেন হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু বেরোনিকা কস্তা। এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্নের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

দেশে প্রথম টিকা নেওয়ার আগে অনুভূতি জানতে চাইলে রুনু বেরুনিকা কস্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বৈশ্বিক মহামারির মধ্যে অনেক দেশ টিকা না পেলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য করোনা টিকার ব্যবস্থা করেছেন। উনি দেশে টিকা আনতে পেরেছেন। উনার ইচ্ছা অনুযায়ী একজন নার্সকে দিয়ে টিকাদান শুরু কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। আমি স্বেচ্ছায় টিকা নিতে রাজি হয়েছি।’

রুনু বেরুনিকা কস্তা আরো বলেন, ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টা অনেক ওষুধেই রয়েছে, কার বডিতে এটা কাজ করবে এবং কার বডিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে সেটা অন্য হিসাব। এটা (করোনা টিকা) তৈরি করা হয়েছে একটা ভালো উদ্দেশ্যে। এখন কার বডিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে সেটা তো আর কেউ আগে থেকে বলতে পারবে না। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভয় পেলে কেউই এই টিকা নেবে না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম মঙ্গলবার রাতে এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘টিকা কার্যক্রমের উদ্বোধনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পুরো কার্যক্রমটি সাজানো হয়েছে। বুধবার ২৫ জনকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে টিকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার কুর্মিটোলাসহ মোট পাঁচটি হাসপাতালে এ টিকা দেওয়া হবে। সেজন্যও অধিকাংশ প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।’

প্রথম দিন কারা এই টিকা নিচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে খুরশীদ আলম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘প্রথম দিনে সম্মুখসারির করোনা যোদ্ধাদের এই টিকা দেওয়া হবে। এদের মধ্যে থাকবেন নার্স, ডাক্তার, পুলিশ, সেনা সদস্য, আনসার, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, আমলা ও রাজনীতিক। এখনো পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত তাতে, মোট ২৫ জনকে প্রথম দিন টিকা দেওয়া হবে।’

রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে করোনাভাইরাসে টিকা দেওয়া হবে বুধবার বিকেলে। এজন্য মঙ্গলবার ওই হাসপাতালে টিকাদানের মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ছবি : স্টার মেইল
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু বেরোনিকা কস্তা প্রথম টিকাটি নেবেন। তিনি কুর্মিটোলা হাসপাতালের নার্স। কোনো কারণে তার টিকা নিতে অসুবিধা হলে প্রথম টিকাটির জন্য আরো একজন নার্সকে ভেবে রাখা হয়েছে।’

২৮ জানুয়ারি দ্বিতীয় দিন টিকা দেওয়া হবে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ উপলক্ষে সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে।

জানতে চাইলে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সারওয়ার উল আলম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের সব প্রস্তুতি নেওয়া শেষ। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার পর থেকে টিকা দেওয়া শুরু হবে। ওইদিন মোট ৫০ জনকে টিকা দেওয়া হবে। এখনো পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত রয়েছে।’

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. জুলফিকার আহমেদ আমিন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘কোভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। টুকটাক কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যা সম্পন্নের চেষ্টা চলছে। কাকে কাকে টিকা দেওয়া হবে, তাও নির্ধারণ করা শেষ। যদিওবা কতজনকে টিকা দেব তা এখনি জানাতে পারছি না।’

করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য (ভাইরোলজিস্ট) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেছিলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের মতো করে নির্মাণ করা হবে করোনার টিকাকেন্দ্র। প্রতি কেন্দ্রে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন, যারা টিকা দেবেন। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন চারজন। যারা কার্ডে ব্যক্তির নাম, বয়স, জন্মতারিখ, মা-বাবার নাম, ঠিকানার পাশাপাশি নিবন্ধন নম্বর, নিবন্ধনের তারিখ বা ভোটার আইডির নম্বর দেখবেন। টিকা নেওয়ার দিন কার্ডটি সঙ্গে করে কেন্দ্রে আসতে হবে।’

করোনার টিকার নিবন্ধন করবেন যেভাবে

ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে ইতোমধ্যে কেনা ৫০ লাখ করোনাভাইরাসের টিকা ও ভারত সরকারের দেওয়া ২০ লাখ টিকা ইতোমধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে। এ টিকা যাঁরা গ্রহণ করবেন তাঁদের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী টিকাদান প্রক্রিয়া ছয় ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথমে এনআইডি কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধন। অনলাইন পোর্টাল থেকে ভ্যাকসিন কার্ড সংগ্রহ। এরপর ভ্যাকসিন দেওয়ার তারিখ ও তথ্য পাঠানো হবে। নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হবে এবং প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে নির্দিষ্ট তারিখে পরবর্তী ডোজ টিকা দেওয়া হবে। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পর সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম থেকে ভ্যাকসিন সনদ দেওয়া হবে। ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছে সরকার। আর নিবন্ধনের জন্য সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে আইসিটি বিভাগ।

যেভাবে নিবন্ধন করবেন

১৮ বছরের নিচে যাঁরা তাদের জন্য কোনো ভ্যাকসিনের ট্রায়াল এখন পর্যন্ত কোথাও হয়নি। তাই সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মেও তাঁরা নিবন্ধনের বাইরে থাকবেন। প্রথমে www.surokkha.gov.bd এই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে প্রথমেই আছে ভ্যাকসিনের জন্য নিবন্ধনের ট্যাব। সেখানে ক্লিক করে দেখা যাবে পরিচয় যাচাইয়ে এই অ্যাপ্লিকেশনে ১৮টি শ্রেণি করা হয়েছে। যার একটি সিলেক্ট করার পর জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে নিবন্ধন শুরু করতে হবে।

এই ১৮টি শ্রেণির মধ্যে রয়েছে নাগরিক নিবন্ধন, সরকারি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অনুমোদিত সব বেসরকারি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মকর্তা-কর্মচারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা, সম্মুখসারির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সামরিক ও আধা সামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী, সম্মুখ সারির সংবাদকর্মী, প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় প্রতিনিধি, সৎকার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অপরিহার্য কার্যালয়ের কর্মীরা।

এ ছাড়া রয়েছেন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সম্মুখসারির কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবার সম্মুখসারির কর্মী, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর ও নৌবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জেলা ও উপজেলায় জরুরি জনসেবায় সম্পৃক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।

জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর যাচাই হওয়ার পর স্ক্রিনে নিবন্ধনকারীর নাম দেখানো হবে বাংলা ও ইংরেজিতে। সেখানে একটি ঘরে একটি মোবাইল নম্বর দিতে হবে যে নম্বরে টিকাদান সংক্রান্ত তথ্য এসএমএস করা হবে। মোবাইল নম্বর দেওয়ার পর একটি ঘর পূরণ করতে হবে, যেখানে জানাতে হবে নিবন্ধনকারীর কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে কি না, থাকলে কোন কোন রোগ আছে। সেখানে আরেকটি ঘরে জানাতে হবে পেশা এবং তিনি কোভিড-১৯ সংক্রান্ত কাজে সরাসরি জড়িত কি না।

এরপর বর্তমান ঠিকানা ও কোন কেন্দ্র থেকে টিকা নিতে ইচ্ছুক, তা নির্বাচন করতে হবে। সব শেষে তথ্য সংরক্ষণ করলে নিবন্ধনকারীর মোবাইল নম্বরে পাঠানো হবে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি)। সেই ওটিপি দিয়ে ‘স্ট্যাটাস যাচাই’ বাটনে ক্লিক করলে নিবন্ধনের কাজ শেষ হবে। নিবন্ধন হয়ে গেলে টিকার প্রথম ডোজের তারিখ ও কেন্দ্রের নাম এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।

নিবন্ধনের পরের ধাপ

এরপর জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, জন্ম তারিখ দিয়ে লগ ইন করে এসএমএসের মাধ্যমে পাওয়া ওটিপি কোড দিয়ে টিকা কার্ড ডাউনলোড করতে হবে। এসএমএসে যে তারিখ দেওয়া হবে, সেই তারিখে টিকা কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে কোভিড-১৯-এর টিকা নিতে পারবেন নিবন্ধনকারীরা। এভাবে দুটি ডোজ শেষ হলে সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মের ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন থেকে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির সনদ সংগ্রহ করা যাবে।

ভ্যাকসিনেশনের সেন্টার

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা সদর হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, পুলিশ-বিজিবি হাসপাতাল ও সিএমএইচ, বক্ষব্যাধি হাসপাতালে টিকা দেওয়া হবে। টিকা দেওয়ার জন্য সাত হাজার ৩৪৪টি দল তৈরি করা হয়েছে। একটি দলের মধ্যে ছয়জন সদস্য থাকবেন। এর মধ্যে দুজন টিকাদানকারী (নার্স, স্যাকমো, পরিবারকল্যাণ সহকারী) ও চারজন স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন।

Add Comment