২০২৬ NRL মৌসুমের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি তৈরি হলো সিডনির অ্যালিয়াঞ্জ স্টেডিয়ামে, যেখানে দক্ষিণ সিডনি র্যাবিটোহস ফরোয়ার্ড জাই অ্যারো তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে মাঠে নামলেন। দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে সাময়িকভাবে এক হয়ে তাকে সম্মান জানায় র্যাবিটোহস ও সিডনি রুস্টার্স।
মোটর নিউরোন ডিজিজ বা MND শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসাজনিত কারণে অবসরের ঘোষণা দেওয়া অ্যারো শুক্রবার রাতে র্যাবিটোহসের জার্সিতে নিজের ১০০তম ম্যাচ খেলতে মাঠে ফেরেন।
তার শেষ ম্যাচে মাঠে থাকার সময় ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত উপস্থিতির গুরুত্ব ছিল পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি।
কিক-অফের আগে দুই দলের খেলোয়াড়রা একসঙ্গে অ্যারোকে সম্মান জানান। গ্যালারির হাজার হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান এবং সতীর্থরা তাকে ঘিরে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করেন।
চিকিৎসাজনিত অবসর নেওয়ার পরও NRL বিশেষ অনুমতি দিয়েছিল যাতে অ্যারো দক্ষিণ সিডনির নিয়মিত মৌসুমের শেষ দুই ম্যাচে প্রতীকীভাবে অংশ নিতে পারেন। এই দুই ম্যাচের মাধ্যমে র্যাবিটোহসের হয়ে তার ম্যাচসংখ্যা ৯৮ থেকে ১০০-তে পৌঁছায়।
শেষ ম্যাচে অ্যারোর আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছিল প্রায় এক সেকেন্ড।
ম্যাচের প্রথম প্লেতে মাঠে অবস্থান করার পর তাকে বদলি করা হয়। এর মধ্য দিয়েই তিনি র্যাবিটোহসের হয়ে শততম ম্যাচ পূর্ণ করেন এবং ৪০ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ অধ্যায় সম্পন্ন করেন।
মাঠ ছাড়ার সময় অ্যারো সমর্থকদের উদ্দেশে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে অভিবাদন জানান। পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানায় এবং কোচ ওয়েইন বেনেট তাকে জড়িয়ে ধরেন।
অ্যারো আগেই জানিয়েছিলেন, অসুস্থতার কারণে হঠাৎ ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার পরও র্যাবিটোহসের হয়ে ১০০ ম্যাচ পূর্ণ করতে পারা তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ অনুমতিতে শেষ দুই ম্যাচ খেলার আগে প্রথম শ্রেণির রাগবি লিগে তার ম্যাচসংখ্যা ছিল ১৭৮, যার মধ্যে দক্ষিণ সিডনির হয়ে ৯৮টি। এর আগে তিনি ব্রিসবেন ব্রঙ্কোস ও গোল্ড কোস্ট টাইটানসের হয়েও খেলেছেন এবং স্টেট অব অরিজিনে কুইন্সল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ান খেলাধুলার সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি হলো দক্ষিণ সিডনি ও সিডনি রুস্টার্সের দ্বৈরথ। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই ক্লাবের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলে আসছে।
তবে অ্যারোর বিদায়ের রাতে এই ঐতিহাসিক বৈরিতা কিছু সময়ের জন্য থেমে যায়।
রুস্টার্সের খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগে তাকে সম্মান জানান এবং বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদনে অংশ নেন। সাবেক সতীর্থ থেকে শুরু করে NRL-এর বিভিন্ন ক্লাবের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারাও অ্যারোর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন।
রুস্টার্সের কনর ওয়াটসন ম্যাচের আগেই বলেছিলেন, অ্যারোর পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে রাগবি লিগের চেয়েও বড় কিছু বিষয় জীবনে রয়েছে।
অ্যালিয়াঞ্জ স্টেডিয়ামের আবহও কয়েক মিনিটের জন্য ঠিক সেই অনুভূতিই তৈরি করেছিল।
তবে ম্যাচ শুরু হতেই পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরে আসে। দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে একাধিক উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
স্পেন্সার লেনিউ দক্ষিণ সিডনির খেলোয়াড়দের সঙ্গে কয়েকবার তর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে কেয়ন কোলোমাটাঙ্গির সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় নজরে আসে।
ম্যাচের শেষদিকে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকজনকে সিন-বিনে পাঠানো হয়।
তবে মাঠের এই উত্তেজনাও অ্যারোর বিদায়ের আবেগকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
ম্যাচে দক্ষিণ সিডনি র্যাবিটোহস শেষ পর্যন্ত দাপট দেখিয়ে রুস্টার্সকে ৫০-২০ ব্যবধানে হারায়।
এই জয়ে র্যাবিটোহস নিউক্যাসলের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ফাইনাল খেলার সুযোগ নিশ্চিত করে।
অ্যারোর বিদায়কে ঘিরে পুরো সপ্তাহজুড়ে দলটির ভেতরে আবেগ ছিল তীব্র। কিন্তু খেলোয়াড়রা সেই আবেগকে মাঠে শক্তিতে পরিণত করেন এবং মৌসুমের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্স উপহার দেন।
অ্যালেক্স জনস্টন তার দুর্দান্ত ট্রাই-স্কোরিং ফর্ম অব্যাহত রাখেন, আর ডেভিড ফিফিতা র্যাবিটোহসের অন্যতম সেরা পারফরমার ছিলেন।
ল্যাট্রেল মিচেলের ফেরাও দক্ষিণ সিডনিকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফাইনাল সামনে রেখে দলটির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।
র্যাবিটোহস আটটি ট্রাই করে বড় জয় নিশ্চিত করে, যা অ্যারোর বিদায়ী রাতকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগেই জানিয়েছিলেন, তারা এই ম্যাচে অ্যারোকে যথাযথভাবে সম্মান জানাতে চান। বড় ব্যবধানের জয় তাদের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে রুস্টার্স নিজেদের ফাইনাল অভিযান সামনে রেখে কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিয়েছিল। ফলে তারা দক্ষিণ সিডনির তীব্রতা ও গতি সামলাতে পারেনি এবং টানা তৃতীয় পরাজয়ের মুখে পড়ে।
অ্যারোর বিদায়ের আবেগ শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
৩১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড MND-এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করেছেন এবং যতদিন সম্ভব পরিবারকে সময় দেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন।
র্যাবিটোহসের হয়ে শততম ম্যাচের আগে অ্যারো জানিয়েছিলেন, তিনি অন্তত আরও এক দশক বেঁচে থাকার আশা করেন।
দীর্ঘ সময় MND নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের উদাহরণ থেকেও তিনি অনুপ্রেরণা নেন। এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
স্ত্রী বেরিনা এবং ছোট মেয়ে আয়লাকে নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন অ্যারো।
নিজের রোগকে ভবিষ্যৎ জীবনের একমাত্র পরিচয় হিসেবে দেখতে চান না তিনি। বরং MND সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং একই রোগের মুখোমুখি হওয়া অন্য মানুষদের আশা দিতে ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছেন।
এই মানসিকতা পুরো রাগবি লিগ সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
দক্ষিণ সিডনির সমর্থকেরা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারাও নিয়মিতভাবে তাকে সমর্থন জানিয়েছেন।
আগের সপ্তাহে গোল্ড কোস্টের বিপক্ষে বিশেষ প্রত্যাবর্তনের সময়ও অ্যারোকে ঘিরে আবেগঘন দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। শুক্রবারের শততম ম্যাচে সেটি আরও বড় রূপ নেয়।
প্রথম শ্রেণির রাগবি লিগে প্রায় এক দশকের ক্যারিয়ারে অ্যারো নিজেকে কঠোর পরিশ্রমী ও নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
২০১৬ সালে ব্রিসবেনের হয়ে NRL-এ অভিষেকের পর গোল্ড কোস্ট টাইটানসে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। পরে ২০২১ সালে দক্ষিণ সিডনিতে যোগ দেন।
স্টেট অব অরিজিনে কুইন্সল্যান্ডের হয়ে ১২টি ম্যাচও খেলেছেন অ্যারো।
র্যাবিটোহসের হয়ে তার অবদান শুধু মাঠের পারফরম্যান্সেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
২০২৫ সালে তিনি ক্লাবের বর্ষসেরা খেলোয়াড় হিসেবে George Piggins Medal জিতেছিলেন। একই বছর Bob McCarthy Clubperson of the Year এবং Souths Cares পুরস্কারও পেয়েছিলেন।
এই স্বীকৃতিগুলো মাঠে ও মাঠের বাইরে দক্ষিণ সিডনির জন্য তার অবদানের প্রতিফলন।
এ কারণেই তার শেষ ম্যাচকে ঘিরে পুরো NRL-এ এমন গভীর আবেগ দেখা গেছে।
ম্যাচের পর র্যাবিটোহস ও রুস্টার্স আবার নিজেদের ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরে গেলেও কিক-অফের আগের কয়েক মিনিট ছিল একেবারেই ভিন্ন।
অ্যারোর শেষ ম্যাচে আনুষ্ঠানিক খেলার সময় হয়তো মাত্র এক সেকেন্ড ছিল, কিন্তু সেই এক সেকেন্ডকে ঘিরে দর্শকদের করতালি, খেলোয়াড়দের আলিঙ্গন এবং স্টেডিয়ামের আবেগ তার প্রতি রাগবি লিগের সম্মানের গভীরতা স্পষ্ট করেছে।
অ্যারো হয়তো আরও অনেক বছর খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক MND রোগনির্ণয় সেই পরিকল্পনা বদলে দিয়েছে।
তারপরও বিশেষ অনুমতিতে শেষ দুই ম্যাচে মাঠে ফিরে র্যাবিটোহসের হয়ে কাঙ্ক্ষিত ১০০ ম্যাচের মাইলফলক পূরণ করতে পেরেছেন তিনি।
তার শেষ রাতটি তাই শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় ছিল না। বরং এমন একটি মুহূর্ত ছিল, যেখানে শতবর্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কিছুক্ষণের জন্য গৌণ হয়ে গিয়েছিল।
জাই অ্যারোর খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলেও অ্যালিয়াঞ্জ স্টেডিয়ামে তার শেষ উপস্থিতির সেই দৃশ্য দীর্ঘদিন NRL ইতিহাসের আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।







