ট্রাম্প দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে কী হবে, রাজনৈতিক সুবিধা পাবে কে?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র ৩২ দিন আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া দেশটিকে সাংবিধানিক সংকটে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মাত্র এক সপ্তাহ আগে আমেরিকানদের বলেছিলেন কোভিড-১৯ নিয়ে বেশি চিন্তা না করতে। কারণ তাঁর মতে, ‘করোনাভাইরাসে আসলে প্রায় কারোই কিছু হয় না, কেবল বয়স্ক এবং হৃদরোগীদের ছাড়া।’ এ কথা বলার এক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্পের কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফল পজিটিভ ধরা পড়ল। শুধু ট্রাম্পই নন, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফলও পজিটিভ এসেছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। চিকিৎসা নিতে হবে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, করোনা শনাক্ত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় নির্বাচনী সমাবেশে যাওয়ার কোনো সুযোগই আর ট্রাম্পের নেই। দুই সপ্তাহের মধ্যে দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের মধ্যে যে দ্বিতীয় টেলিভিশন বিতর্ক হওয়ার কথা, সেটি আদৌ হবে কিনা, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্পের কোভিড-১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ ধরা পড়ার পর এখন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠেছিল, কারণ তাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে দেখা গেছে গত কদিন। তবে সবশেষ খবর অনুযায়ী, পেন্সের করোনা নেগেটিভ এসেছে।

যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার কী হবে? তাঁর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনার কী প্রভাব পড়বে নির্বাচনে? যদি তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন কী ঘটবে? নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে এসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র কি একটি সাংবিধানিক সংকটের মুখে? এসব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে।

করোনার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে বড় বড় নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন, সেটি নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগ ছিল। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা যে ট্রাম্পের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেল, তা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। গতকাল শুক্রবার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অরল্যান্ডোর এক নির্বাচনী সভায় থাকার কথা ছিল। এই সপ্তাহ শেষে তাঁর যাওয়ার কথা উইসকনসিনে। এসব সমাবেশ এখন আর সামনাসামনি হওয়ার সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক সুবিধা কে পাবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থার ওপর। যদি তিনি ‘উপসর্গমুক্ত’ হন, অর্থাৎ করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে যেসব গুরুতর লক্ষণ দেখা যায়, সেগুলো যদি তাঁর না থাকে, তাহলে হয়তো ট্রাম্প আবারও করোনাভাইরাস যে সে রকম গুরুতর কোনো ব্যাপার নয়, তেমন একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। তিনি হয়তো আবারও বলার চেষ্টা করবেন, করোনা নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে।

আবার যদি ট্রাম্প গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, সেটা থেকেও তিনি রাজনৈতিক ফায়দা পেতে পারেন। তাঁর জন্য সহানুভূতির ঢেউ উঠতে পারে, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অসুস্থতা থেকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধী শিবিরের লোকজনকেও বেশ সতর্ক থাকতে হবে। তবে করোনাভাইরাসের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা যেসব সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগাগোড়াই সেগুলো উপেক্ষা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন, এমন অভিযোগও আছে।

এই মহামারির মধ্যেই ট্রাম্প বড় বড় নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন। হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে নিয়মিত নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। এখন ট্রাম্পের বিরোধী শিবিরের লোকজন যদি বলার চেষ্টা করেন যে প্রেসিডেন্ট তাঁর কর্মফল ভোগ করছেন, সেটাকে রিপাবলিকানরা কাজে লাগাতে পারে বিরোধীপক্ষের ‘হৃদয়হীনতা ও সুবিধাবাদিতার‌’ উদাহরণ হিসেবে।

তবে ট্রাম্পের আক্রান্ত হওয়ার এ ঘটনা করোনাভাইরাসকে আবার বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসবে এবং সেটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষতি করতে পারে। এর উল্টোটাও হতে পারে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা প্রেসিডেন্টের পক্ষে আরো বেশি করে জোট বাঁধতে পারে।

এ বিষয়ে মার্কিন রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক এরিক হ্যাম বলেন, ‘এর দুটিই ঘটতে পারে। বেশির ভাগ মানুষই হয়তো চাইবেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি এবং আক্রান্ত সবাই সুস্থ হয়ে উঠুক। কিন্তু আবার এটাও মনে রাখতে হবে, এই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস সম্পর্কে ভুল তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস ছিলেন।’

সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সে রকমই দাবি করেছে। ট্রাম্প শরীরে ব্লিচ ইনজেক্ট করা থেকে শুরু করে কত রকম কথা যে বলেছেন। এখন প্রেসিডেন্ট নিজেই তাঁর বেপরোয়া দৃষ্টিভঙ্গির কারণে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। কাজেই এটি তাঁর বিপক্ষেও যেতে পারে।

ট্রাম্প দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে কী ঘটবে?

হোয়াইট হাউসের চিকিৎসকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প শারীরিকভাবে স্থুলকায়, অর্থাৎ উচ্চতা অনুযায়ী তাঁর যা ওজন থাকা উচিত, তার চেয়ে বেশি। ট্রাম্পের বয়স ৭৪ বছর। এসব কিছুর কারণে ট্রাম্প সেই দলে পড়েন, যাঁদের জন্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অবস্থা দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।

যদি ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে যান, তখন কী করতে হবে, তা মার্কিন সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে।

মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীতে বলা আছে, অসুস্থতার কারণে প্রেসিডেন্ট অক্ষম হয়ে পড়লে দায়িত্ব নেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। সুতরাং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কিছু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকেই তাঁর জায়গা নিতে হবে, সে জন্য পেন্সকে প্রস্তুত থাকতে হবে। এ রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হলে হয়তো পেন্সকে অল্প কিছুদিনের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে।

এ ছাড়া ২৫তম সংশোধনীতে উল্লেখ আছে, প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে সাময়িকভাবে তাঁর ক্ষমতা ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে হস্তান্তর করতে পারেন। যখন আবার প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন, তখন আবার সে ক্ষমতা ফিরিয়ে নিতে পারেন।

আর যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তখন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের জন্য এরপরই আছেন হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। ন্যান্সি এরই মধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আইসোলেশনে গেছেন।

কিন্তু ন্যান্সি পেলোসি হচ্ছেন রিপাবলিকান ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির। কাজেই ন্যান্সির কাছে ক্ষমতা যাওয়ার মানে হচ্ছে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ডেমোক্রেটদের হাতে চলে যাওয়া। ওয়াশিংটন পোস্ট এ রকম একটি পরিস্থিতির কথা কল্পনা করে এ বছরের শুরুতে লিখেছিল, ‘ট্রাম্প ও পেন্সের কাছ থেকে পেলোসির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবেই অনেক আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসবে। যুক্তরাষ্ট্রে যখন একটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা খুব বেশি দরকার, তখন এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে তা আরো বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।’

কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে একটি সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

Add Comment