প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র টুভালু বর্তমানে এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছু বছরের মধ্যেই এই দেশটি সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিজ্ঞানীরা।
অস্ট্রেলিয়া ও হাওয়াইয়ের মাঝামাঝি অবস্থিত টুভালু মূলত নয়টি নিম্ন প্রবাল দ্বীপ (অ্যাটল) নিয়ে গঠিত। এর গড় উচ্চতা মাত্র ৬ ফুট (২ মিটার), এবং সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৫ ফুট (৪.৫ মিটার)। গত ৩০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে, যা এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক এক সংকেত।
ভয়াবহ পূর্বাভাস:
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে টুভালুর অর্ধেক অংশ জলে তলিয়ে যাবে এবং ২১০০ সালের মধ্যে ৯০% ভূমি হারিয়ে যেতে পারে। রাজধানী ফুনাফুতি, যেখানে ৬০% মানুষ বসবাস করেন, সেটিও প্রতিদিনের জোয়ারেই জলের নিচে চলে যাবে।
শুধু জলতল বৃদ্ধিই নয়, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ত পানির কারণে মিষ্টি পানির কূপ ও কৃষিজমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাসিন্দারা এখন মাটি থেকে উঁচুতে ফসল ফলাতে বাধ্য হচ্ছেন, কিন্তু সেটিও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না।
বিশ্বের প্রথম ‘জাতীয় অভিবাসন’ পরিকল্পনা:
এই বিপর্যয়ের মুখে ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ও টুভালু একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করে—ফালেপিলি ইউনিয়ন চুক্তি, যা ২০২৪ সালে কার্যকর হয়। এটাই বিশ্বের প্রথম চুক্তি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একটি দেশের জাতীয় পর্যায়ে অভিবাসনের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।
এই চুক্তির আওতায় প্রতিবছর টুভালুর ২৮০ জন নাগরিক অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস, কাজ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাবেন। ১৬ জুন থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত ভিসা আবেদনের সময়সীমায় ৫,১৫৭ জন—অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ—অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন।
প্রথম চার দিনেই আবেদন পড়ে ৩,১২৫টি। এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে টুভালুর মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ ভবিষ্যৎ খুঁজছেন, যদিও তাদের হৃদয় রয়ে যাচ্ছে ডুবে যেতে থাকা নিজ ভূখণ্ডে।
এক করুণ বাস্তবতা:
টুভালুর ভবিষ্যৎ এখন সমুদ্রের করুণ রোষের কাছে বন্দী। যদিও কিছু মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় স্থানান্তরের সুযোগ পাচ্ছেন, বাকিদের ভাগ্য অনিশ্চিত। মানব ইতিহাসে প্রথমবার, একটি জাতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘পরিকল্পিতভাবে’ তাদের দেশ ছাড়তে হচ্ছে। এটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য এক জাগরণবার্তা—জলবায়ু সংকট আর ভবিষ্যতের ব্যাপার নয়, এটি এখনকার বাস্তবতা।







