Home বাংলাদেশ National ড. কামালের দরজায় মাহীর লাথি: রাজনৈতিক চক্রান্তের নাট্যরূপ

ড. কামালের দরজায় মাহীর লাথি: রাজনৈতিক চক্রান্তের নাট্যরূপ

138
0

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘটে যাওয়া নানা অপ্রত্যাশিত ও নাটকীয় ঘটনা আজও অনেকের স্মৃতিতে তাজা। এমন সব বিষয় ঘটেছিল যা অনেকেই কল্পনাও করতে পারেননি। তবুও সে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিএনপিসহ চারটি দল মিলে গঠন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, যার নেতৃত্ব দেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর, জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন সরকারকে পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি সর্বদলীয় ও গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবি জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই ঐক্য কোনো দলের স্বার্থে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থেই গঠিত হয়েছে। এর আগে, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। যদিও দুটি ফ্রন্টই ক্ষমতাসীনদের নানা কৌশলের কারণে রাজনৈতিকভাবে সফলতা অর্জন করতে পারেনি।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা অনেকটাই সরকার দলীয় পরিকল্পনায় পরিচালিত হয়। দুপুরের মধ্যেই ৯৭ জন প্রার্থী ভোট বর্জন করেন। সরকার বিরোধী দলগুলোকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয় এবং ভোটযন্ত্রের কৌশলে আওয়ামী লীগ বৈধতা অর্জন করে নেয়। সেই নির্বাচনকে ঘিরে সংঘটিত কিছু ঘটনা আজও সচেতন মহলে আলোচিত।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেও নানা ষড়যন্ত্রের আলামত দেখা যাচ্ছে, যেখানে নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে। এ সময় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে দেশ নতুন কোনো রাজনৈতিক চক্রান্তের কবলে না পড়ে। এজন্য গণতন্ত্রকামী ও দেশপ্রেমিক সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

একটি আলোচিত ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়—২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যিনি শিক্ষক, থিংকট্যাংক, কলামিস্ট, অভিনেত্রী শমী কায়সারের প্রাক্তন স্বামী এবং প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বন্ধু হিসেবে পরিচিত, একটি পরিকল্পিত অপঘটনার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভাঙার চেষ্টা করেন। সেই সময় তিনি গণমাধ্যমে আগাম জানিয়ে দেন যে, মাহী বি. চৌধুরী ড. কামাল হোসেনের বাড়ির দরজায় ‘লাথি’ মারবেন। এক ঘণ্টা পরেই তা বাস্তবে ঘটে যায়। মাহী চিৎকার ও গালাগাল করতে করতে ড. কামালের বাড়িতে গিয়ে দরজায় লাথি মারেন। যদিও সেই সময় ড. কামাল বাসায় ছিলেন না, তবে ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমে ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে প্রকাশ পায়।

মূলত ঐক্যফ্রন্টকে দুর্বল করার জন্যই আরাফাত তাঁর আত্মীয় মাহীকে ব্যবহার করেন। এমন অপকর্মের বিনিময়ে মাহী কী পেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়, তবে সেদিন রাতেই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎ করেন বলে জানা যায়। এছাড়াও, নির্বাচনের আগে এক প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি কিছু ‘প্রতিবেদন’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংবাদমাধ্যমে সরবরাহ করা হয়, যেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে নানা নেতিবাচক তথ্য ছিল। এসব রিপোর্ট জোরপূর্বক ছাপানো হয়, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেই সম্পাদকদের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দিতেন রিপোর্ট ছাপানোর নির্দেশ দিতে।

এবারের নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২,৫৮২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বৈধ আবেদনপত্র ১,৮৪২টি, আর ৭২৩টি বাতিল হয়েছে। আপিলের সময়সীমা ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত এবং নিষ্পত্তির সময় ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি এবং প্রতীক বরাদ্দ হবে ২১ জানুয়ারি। বড় রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ নির্বাচনে তিনটি প্রধান জোট অংশগ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।

এবারের নির্বাচন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে। কারণ বর্তমান সময়ে প্রচারণার ধরন এবং নির্বাচনি পরিবেশ পাল্টে গেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যেভাবে গুজব, অপপ্রচার এবং তথ্যবিকৃতি ঘটছে, তা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন এক সময়ে আমাদের সবার দায়িত্ব নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ না হতে দেওয়া এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মওলানা ভাসানীর মতো দূরদর্শী নেতার ভূমিকাও আজ প্রাসঙ্গিক। তিনি ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেন, যা ছিল স্বাধীনতার বীজ রোপণের মুহূর্ত। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিলেও, দলটির ভেতরে সুবিধাবাদী রাজনীতি, দূরদর্শিতার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে এখন জনগণের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে দলটি একটি কঠিন রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়ে।

অন্যদিকে, মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন এক সাহসী ও প্রজ্ঞাবান নেতা, যিনি কেবল স্বাধীনতার ঘোষক নন, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎও ছিলেন। তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া সফলভাবে বিএনপিকে পরিচালনা করেন এবং তিনবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর এখন দলের দায়িত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। কিন্তু তাঁকে ঘিরে অনেক সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

জামায়াতে ইসলামী, যারা একসময় বিএনপির মিত্র ছিল, বর্তমানে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকলেও, দলটি সংগঠনের দিক থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র রাজনীতিতে ইসলামি ছাত্রশিবিরের সাফল্য তাদের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।

পরিস্থিতি যাই হোক, এবারের নির্বাচন যে অতীতের চেয়ে ভিন্ন ও কঠিন হবে, তা স্পষ্ট। প্রচলিত কৌশল আর স্লোগান দিয়ে ভোটারদের মন জয় করা যাবে না। কারণ নতুন প্রজন্ম এখন অনেক বেশি সচেতন ও প্রযুক্তি-নির্ভর। স্মার্টফোন আর ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে মানুষ যেমন তথ্য জানতে পারছে, তেমনি গুজব ও অপপ্রচারে বিভ্রান্তও হচ্ছে।

এই বাস্তবতায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শুধুই একটি রাজনৈতিক লড়াই নয়; এটি গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মুহূর্ত। অতএব, যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য জনগণের ঐক্য এবং সচেতন অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here