‘তিতাসকে অনেকবার বলা হইছে, তারা গ্রাহ্য করে নাই’

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন হান্নান মিয়ার ছেলে শাহজালালের অভিযোগ—‘গ্যাসের লাইনের কথা তিতাসকে অনেকবার বলা হইছে, কিন্তু তারা গ্রাহ্য করে নাই। তাদের অবহেলা আর গাফিলতির কারণে এত মানুষ মরে গেলো, কত জন শেষ পর্যন্ত বাঁচবে, সেটাও কেউ জানে না।’
৫০ বছরের হান্নান মিয়া। তার শরীরের ৮৫ শতাংশসহ পুড়ে গেছে শ্বাসনালিও। আগে থেকেই শরীরে বাসা বেঁধেছে ডায়াবেটিস। তাই পুড়ে যাওয়া শরীরের চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসকদের নজরে রাখতে হচ্ছে তার ডায়াবেটিসের দিকেও।

হান্নান মিয়ার ছেলে শাহজালাল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাদের বাসা মসজিদের সামনেই। এলাকার লোকজন মসজিদের গ্যাসের সমস্যার কথা তিতাস কোম্পানিকে অনেকবার বলেছে। কিন্তু তারা গ্রাহ্য করে নাই। তিনি বলেন, ‘তিতাসের কাছে অনেকবার যাওয়া হইছে, অনেকবার বলা হইছে। কিন্তু কিছুই হয় নাই।’

অথচ আজ কতগুলা মানুষ মারা গেলো। কতগুলা মানুষ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, বলেন শাহজালাল।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে এশার নামাজের সময় নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ফরজ নামাজের মোনাজাত শেষে অনেকে সুন্নত ও অন্য নামাজ পড়ছিলেন। এ সময় মসজিদের ভেতরে প্রায় ৪০ জন মুসল্লি ছিলেন। বিস্ফোরণে তাদের প্রায় সবাই দগ্ধ হন। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতাল এবং পরে ৩৭ জনকে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় ২৪ জন। বাকি ১৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, এদের মধ্যে ছয় জন আইসিইউতে আছেন। তবে চিকিৎসাধীন থাকা কেউ আশঙ্কামুক্ত নন। তাদের সবার শ্বাসনালি পুড়ে গেছে।

প্রাথমিকভাবে ছয়টি এসি বিস্ফোরণে এ ঘটনা ঘটেছে বলা হলেও রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এসি বিস্ফোরণে নয়, মিথেন গ্যাস থেকে আগুন ধরে বা স্পার্ক করে নারায়ণগঞ্জের তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, প্রাথমিকভাবে এ ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ডিফেন্স অফিসের পরিচালক অপারেশন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে টেলিফোনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এসি থেকে এমন বিস্ফোরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরাও। অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়ে ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ডা. হোসাইন ইমাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এসি বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন হচ্ছে—এসি থাকে ওপরে। সেখান থেকে যে ব্লো আসে সেটা লাগার কথা মুখে। এজন্য সবার শ্বাসনালি পুড়ে গেছে—ধরে নিলাম এটা। কিন্তু সবার হাত-পা কীভাবে শতভাগ পুড়ে গেলো? পা তো নিচে, এসির ব্লো তো সে পর্যন্ত যাওয়ার কথা না।’ যোগ করেন তিনি।

বিস্ফোরণ ও আগুনে গুরুতর আহত আব্দুস সাত্তার আছেন আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র)। তার স্ত্রী রুবী আক্তার সেখান থেকে এক পা-ও এদিক-সেদিক নড়তে চান না। যদিও চিকিৎসার প্রয়োজনে, রোগীদের স্বার্থে তাকে মাঝে মাঝেই থেকে বের হতে হয়। কিন্তু ওইটুকুই। তিনি কিছুতেই আইসিইউ’র দরজার সামনে থেকে আড়াল হচ্ছেন না।

রুবী আক্তার জানান, সেই যে ৪ আগস্ট রাতের বেলায় হাসপাতালে ঢুকেছেন আর বের হননি। ছেলে সাইফ ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছে। মাঝে মাঝে আসে বাবার খোঁজখবর নেয়। দরজার ওপার থেকে বাবাকে দেখে যায়। নারায়ণগঞ্জে দাদিকে ফোন করে ছোট বোনের খবর নেয়। মা আর বাবাকে রেখে সেও নারায়ণগঞ্জ যেতে পারছে না।

কিশোর সাইফ জানায়, তার বাবা আব্দুস সাত্তার নারায়ণগঞ্জে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। একমাত্র ছোট বোন সাদিয়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সাদিয়া বারবার ফোন করে বাবার কথা জানতে চায়। কেন বাবাকে নিয়ে মা আর ভাই বাড়ি ফিরছে না, সে বারবার প্রশ্ন করে দাদিকে পাগল কররে ফেলছে, রাস্তার দিকে চেয়ে আছে।

আইসিইউর ভেতরে বাবা, আইসিইউর বাইরে কাঁদতেছেন মা, আর বোনটা বারবার আমাকে ফোন করতেছে। আমি কী করবো? কাকে রেখে কাকে দেখবো, বলেই কাঁদতে শুরু করে সাইফ।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় গুরুতর আহতদের একজন আব্দুস সাত্তার। ৪০ বছরের আব্দুস সাত্তারের শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে, পুড়েছে শ্বাসনালি।

কিশোর সাইফ ঘটনার দিন মসজিদের পাশেই ছিল, মসজিদের পাশেই তাদের বাসা। সে জানায়—‘আগুন যখন লাগছে তখন নিজের চোখেই দেখেছি সেটা। সময়টা সাড়ে আটটার মতো। খুব বেশি শব্দ হয় নাই। কিন্তু বিস্ফোরণটা যেভাবে জ্বলছে… বুঝতেই পারতেছেন। কিছু মানুষ নামাজ পড়ে বের হয়ে গেছেন, আর কিছু মানুষ ছিল। বাসায় গিয়েই জানতে পারি আব্বু ফোন ধরতে ছিল না। আম্মু টেনশন করতেছিল। সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে ছুটে যাই। চেনা মানুষদের জিজ্ঞেস করি আব্বু কোথায়। তখনই জানতে পারি তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। পরে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি, সেখান থেকে তারা ঢাকা মেডিক্যাল পাঠায়ে দিছে।’

তারপরই তারা মা-ছেলে মিলে চলে আসেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। আর তখন থেকেই সময়ের কাঁটা এখানে স্থির হয়ে আছে এই পরিবারটির।

স্থানীয় হওয়াতে প্রায় বেশিরভাগ মানুষই পরিচিত। চোখের সামনে কত মানুষ চলে গেলো। আব্বু এখনও আইসিইউতে। ডাক্তাররা সেভাবে কিছু না বললেও সাইফের মনের ভেতরে ঝড় চলছে, সেটা বোঝা গেলো কিশোর এই ছেলেটির কথায়।

পুরো একটা দিন যাবার পর আব্দুস সাত্তার আজ কিছুটা কথা বলেছেন। কথা বলতে চেয়েছিলেন ছেলের সঙ্গে। আর সে কথা বলতে গিয়ে কিশোর সাইফ হঠাৎ করেই যেন বড় হয়ে যায়। কান্না চেপে রাখে। রুদ্ধ কণ্ঠকে শাসন করতে চায়। কিন্তু যে বাবা আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, তার কিশোর ছেলের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

বাবার নিজের এ অবস্থা, অথচ উনি আমার কাছে জানতে চাইলেন ‘আমি সুস্থ আছি কিনা, আমি সেদিন মসজিদে ছিলাম কিনা’—বলতে বলতে নিজেকে আর শক্ত করে রাখতে পারে না সাইফ, চোখ ঢেকে ফেলে সে। হয়তো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিশোর ছেলেটা নিজের অজান্তেই বড় হয়ে উঠেছে।

কিছুটা সময় নেয় সাইফ…স্থির হয়ে বলে, ‘আব্বু আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু কথা বোঝা যাচ্ছিল না, তাই চলে এসেছি। বাবা কথা বলছে, কিন্তু তার কথা বোঝা যাচ্ছে না—এটা আমি দেখতে পারছিলাম না। কিন্তু মা আর ভেতরে থেকে বের হতে চান না আব্বুরে ছাইড়া।’

Add Comment