পায়রাকে গড়তে গিয়ে চাপে চট্টগ্রাম বন্দর

অদূরভবিষ্যতে বড় পরিসরে ব্যবহারের সম্ভাবনা না থাকলেও বিপুল অর্থ ব্যয়ে পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াও অ্যাপ্রোচ চ্যানেলে বড় ধরনের ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন পড়বে। এ কাজের ব্যয় মেটাতে অনুদান হিসেবে ৪৬১ কোটি ৯০ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরকে।

পায়রা বন্দর গড়তে গিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর নিজেই সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বন্দর ব্যবহারকারীসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সমুদ্রপথে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বাণিজ্যিক বিবেচনায় দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী এমনিতেই চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা অপর্যাপ্ত। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর ফান্ডের অর্থ যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে দেয়া হয়, তাহলে বন্দরের উন্নয়ন ব্যাহত হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর ফান্ডে সর্বশেষ ৮ হাজার কোটি টাকা ছিল। সেখান থেকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুকূলে ৪৬১ কোটি ৯০ লাখ টাকা প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বন্দরের পর্ষদ সভায়। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে প্রথম দফায় ৫০০ কোটি টাকা প্রদানের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হয়েছে একই সভায়। প্রথম ধাপে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পায়রা বন্দরে অর্থ ছাড়ের পর চট্টগ্রাম বন্দর ফান্ডের আকার ৭ হাজার ৩৮ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

নিজস্ব এ ফান্ড থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ ব্যয় করা হয়। এছাড়া পরিচালন কার্যক্রমের জন্য ইকুইপমেন্ট, জনবল ও অপারেশনাল ব্যয়ও নির্বাহ করা হয় এ ফান্ডের অর্থে। বন্দরের নিজস্ব এ ফান্ডের অর্থ অন্যত্র খরচ করাটা সারা বিশ্বের বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা।

তারা বলছেন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পাদনে বিশ্বের যেকোনো বন্দরই অনেক বেশি ফ্লেক্সিবল। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্যও সে সুযোগ রাখতে হবে। বন্দর কস্ট বেইজড ট্যারিফে চলে। তাই বন্দরের হাতে টাকা না থাকলে এ বন্দর যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়বেন। প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকলে বন্দর কর্তৃপক্ষ অপারেশনাল চার্জ বাড়িয়ে দেয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

এদিকে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম বন্দরের আয়েও টান পড়েছে। সম্প্রতি বন্দরের অনিরীক্ষিত হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় (পরিচালন ও অপরিচালন-নন অপারেশনাল খাত) হয়েছে ২ হাজার ৯৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এখান থেকে রাজস্ব ব্যয় ১ হাজার ৭০১ কোটি ১৪ লাখ টাকা ও আয়কর পরিশোধ করা হয়েছে ৪১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ কর-পরবর্তী প্রকৃত আয় হয়েছে ৮২২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বন্দরের প্রকৃত আয় ছিল ৮৩৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকৃত আয় কমেছে প্রায় ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

আগের অর্থবছরের তুলনায় আয় কমলেও ব্যয় কিন্তু ঠিকই বেড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭০১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ১ হাজার ৬০৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব ব্যয় বেশি হয়েছে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়-ব্যয়ের এ হিসাবের মধ্যে ব্যাংক সুদ থেকে প্রাপ্ত টাকা এবং মূলধনি ব্যয় (উন্নয়ন প্রকল্প, নতুন কেনাকাটা বাবদ খরচ) হিসাব করা হয়নি। তবে মূলধনি ব্যয় হিসাব করা না হলেও অবচয় বাবদ প্রতি বছর নির্দিষ্ট অংকের টাকা রাজস্ব ব্যয়ের মধ্যে ঠিকই যুক্ত হচ্ছে।

রাজস্ব আয়-ব্যয়ের এ পরিস্থিতিতেই পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে বড় অংকের অনুদান দিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী পরিষদ। সংগঠনটির সভাপতি আবুল মনছুর আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্দর যে ব্যবস্থাপনায় চলছে সেক্ষেত্রে এভাবে ফান্ড সংকট তৈরি করা হলে চট্টগ্রাম বন্দর বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হবে। আর দেশের প্রধান এ সমুদ্রবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এর খারাপ প্রভাবটি পরিলক্ষিত হবে। আমরা গতকালও বিষয়টি নিয়ে বন্দরের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছি। আর্থিক বিষয়টির পাশাপাশি মানসিক বিষয়টিও এখানে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় বন্দর কর্মকর্তা-কর্মীদের নৈতিক মনোবল ভেঙে পড়বে নিঃসন্দেহে। এখানে পারফরম্যান্স বিবেচনা করার সুযোগটাও আর থাকবে না।

প্রসঙ্গত, এর আগেও ২০১৪ সালের ১৫ মে সম্পাদিত একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে পায়রা বন্দরকে ৪৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা সুদবিহীন ঋণ দিয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর, যা ২০ কিস্তিতে পরিশোধের কথা ছিল। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের ফান্ড থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৫০০ কোটি টাকা প্রদানের ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বাকি অর্থ ছাড়করণের ব্যাপারেও নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা হয়েছে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পায়রা বন্দরের অনেক কাজই চট্টগ্রাম বন্দরের ফান্ড নিয়ে করা হয়েছে। এখন তো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর ফান্ড সরকারকে দেয়ার একটা আইন হয়েছে। আমি মনে করি সব উন্নয়নের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত করার একটা পদক্ষেপ এটি। এটা সব সময় ইতিবাচক নাও হতে পারে। আমরা জানি, চট্টগ্রাম বন্দরের ফান্ডের ওপর একটা নজর রয়েছে। অনেক আগে থেকেই পায়রা বন্দরের খরচগুলো এখান থেকে নির্বাহ করা হচ্ছে। এ প্রবণতা দিন দিন শুধু বাড়ছেই। পায়রা বন্দর করার পুরো ব্যাপারটাই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। পায়রা বন্দর যে কখনো লাভজনক হবে তা বলার সময় এখনো আসেনি। কারণ এটা অনেক ভেতরে এবং এর চ্যানেলকে নাব্য রাখার জন্য আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এটা নিয়ে এক ধরনের জবরদস্তি করা হচ্ছে। সহজভাবে যদি বলি মাতারবাড়ী বন্দর, বে-টার্মিনাল এগুলো হয়ে গেলে কিন্তু উপযুক্ত বিকল্প গড়ে উঠত। ধারণা করছি, বন্দর ফান্ড থেকে অর্থ নেয়ার জন্যই স্বায়ত্তশাষিত সংস্থার এক্সেস ফান্ড নেয়ার আইন পরিবর্তন করা হয়েছে।’

বিপুল এ অর্থ ব্যয়ের পরও পায়রা বন্দর যে খুবই সীমিত পরিসরে ব্যবহার হবে, তা জাইকার একটি সমীক্ষায়ও বলা হয়েছে। মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর একটি চূড়ান্ত সমীক্ষা প্রতিবেদনে পায়রাসহ মাতারবাড়ী ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনের তুলনামূলক প্রাক্কলন করেছে জাইকা। এতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সাল নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহন হবে ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউএস। ওই সময় পায়রা বন্দরের মাধ্যমে পরিবহন হবে মাত্র ৪ লাখ ৮০ হাজার ৫২৬ টিইইউএস। বরং পায়রার চেয়ে মাতারবাড়ীতে কনটেইনার পরিবহন হবে বেশি, ৯ লাখ ৯৯ হাজার টিইইউএস।

তিনটি আলাদা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েও সমীক্ষার তথ্যে সামগ্রিক চিত্রটি একই রকম দেখা যায়। এমনকি এ পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে ২০৪১ সাল নাগাদও। সে নাগাদ তিনটি বন্দরে পণ্য পরিবহন বাড়লেও অবস্থানের পরিবর্তন হবে না বলে জাইকার সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে। ২০৪১ সালে ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার ১৭৯ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করবে চট্টগ্রাম বন্দর। ওই সময় মাতারবাড়ীর মাধ্যমে ২৫ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৯ টিইইউএস ও পায়রার মাধ্যমে মাত্র ৫ লাখ ৪৬ হাজার ২২৮ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হবে।

ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মু. সিকান্দার খান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশে বন্দর হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বন্দর ন্যাচারাল বন্দর হিসেবে তার প্রাকৃতিক গুণাবলি আছে, যার ধারেকাছে নেই পায়রা বন্দর। সেখানে প্রাকৃতিক অবস্থান যদি ভালো হতো কিংবা সত্যিকার অর্থে অনুকূলে থাকত তাহলে কিন্তু কোনো আপত্তি থাকত না। পায়রায় ১ হাজার কোটি টাকা দিয়ে যে কাজটি করা হবে চট্টগ্রামে সেই একই কাজ করতে ৩০০ কোটি টাকাও লাগে না। আমাদের যে সীমিত সম্পদ তাতে মেজর পোর্টকে অভুক্ত রেখে তার টাকা দিয়ে এমন একটা জায়গায় কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যেখানে অনেক বেশি প্রতিকূলতা রয়েছে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব আয় কমার পরও কেন অন্য সংস্থায় বন্দর ফান্ডের অর্থ দেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আমদানি-রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ সময়ে ব্যবসায়ীদের স্টোর রেন্ট মওকুফ করে সুবিধা দেয়া হয়েছে। ফলে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এর একটা প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে বন্দরের পরিচলন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে খরচ বাড়লেও এর বিপরীতে মাশুল বাড়ানো হয়নি। নতুন করে জনবলও নিয়োগ হয়েছে এর মধ্যে। ফলে ব্যয় বেড়েছে। আর বন্দর ফান্ড থেকে অর্থ ছাড়ের ব্যাপারে সরকারের নির্দেশনামতোই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

Add Comment