আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আলোচিত প্রার্থীদের তালিকায় একটি ব্যতিক্রমী নাম মিজানুর রহমান—যিনি সর্বাধিক পরিচিত ‘ওয়াসা মিজান’ নামে। নাগরিক অধিকার ও জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাওয়া এই ব্যক্তি এবার সংসদে যাওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।
২০১৯ সালে ঢাকা ওয়াসার দীর্ঘদিনের দূষিত পানির সমস্যার বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ করে প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসেন মিজানুর রহমান। সে সময় তিনি ওয়াসার সরবরাহ করা পানি দিয়ে শরবত তৈরি করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সামনে তুলে ধরেন—যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি ‘ওয়াসা মিজান’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তবে ভাইরাল খ্যাতিতেই থেমে যাননি তিনি। শ্যামপুর, কদমতলী ও যাত্রাবাড়ীর আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা–৪ আসনের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা—বিশেষ করে পানি, গ্যাস, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের বিরুদ্ধে নিয়মিত সোচ্চার থেকেছেন তিনি।
এবার নির্বাচনী মাঠেও নিজের প্রতিবাদী পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ব্যতিক্রমী কৌশল নিয়েছেন মিজানুর রহমান। গত ৩০ জানুয়ারি রাজধানীর জুরাইন–দয়াগঞ্জ সড়কের পাশে মুন্সিবাড়ী মোড়ের একটি ময়লার ভাগাড়ের পাশে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। প্রতীকী এই আয়োজনের মাধ্যমে তিনি রাজধানীর অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার দিকটি তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে জানান।
তার নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—মহল্লা সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করে গলির বাসিন্দাদের নিয়ে ‘গলি সমাজ’ গঠন, যার মাধ্যমে স্থানীয় নাগরিক ও সামাজিক সমস্যার তদারকি ও সমাধান নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘এমপি হটলাইন ও ওয়েবসাইট’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
জলাবদ্ধতা নিরসনে রাস্তার উচ্চতা বাড়িয়ে মানুষের বাড়িঘর ও দোকানপাট ডুবিয়ে দেওয়ার প্রচলিত উন্নয়ন মডেলকে ‘ভ্রান্ত’ উল্লেখ করে তিনি টেকসই ও সহজ পদ্ধতিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত পরিষ্কারের অঙ্গীকার করেছেন।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচিত হলে তিন মাসের মধ্যে রাস্তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং জনগণের সম্মতিতে একটি ‘রাস্তা সুরক্ষা চার্টার’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। এই চার্টার অনুযায়ী, যেকোনো সড়ক খোঁড়ার কাজ সাত দিনের মধ্যে শেষ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে।
পানি সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিলের বিপরীতে সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা ওয়াসাকে বাধ্য করার কথাও রয়েছে তার ইশতেহারে। পাশাপাশি গ্যাস বৈষম্য বন্ধে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং এলপিজি সরবরাহকারীদের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
এছাড়া প্রতিটি মহল্লায় পর্যাপ্ত ওএমএস ও টিসিবি কার্যক্রম চালু, দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্তভাবে কার্ড ও পণ্য বিতরণ, তিন স্তরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (জৈব, রিসাইকেলযোগ্য ও বিপজ্জনক বর্জ্য) চালু এবং সরকারি সংবেদনশীল স্থাপনা ছাড়া অন্যান্য উন্মুক্ত সরকারি স্থান বিকেল ও ছুটির দিনে খেলাধুলা ও অবসরের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে রেললাইনের দুই পাশে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো, ময়লা পোড়ানো বন্ধ, দূষণকারী কারখানার তালিকা প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ রোধ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি বাসায় ‘ডেঙ্গুযোদ্ধা’ তৈরি এবং প্রতি ওয়ার্ডে মাসে অন্তত একটি ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প চালুর অঙ্গীকার করেছেন মিজানুর রহমান।
নারী নিরাপত্তা জোরদারে প্রতিটি মহল্লায় নারী নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গঠন, হকার ও টং দোকানদারদের উচ্ছেদের পরিবর্তে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় আনা এবং সংসদে দেশবিরোধী ও পরিবেশবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে তার ইশতেহারে।
উল্লেখ্য, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। প্রাথমিকভাবে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হলেও, পরে সমর্থকদের সশরীরে হাজিরা ও হলফনামার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে।
প্রতিবাদী রাজনীতি থেকে সংসদে যাওয়ার এই যাত্রায় ‘ওয়াসা মিজান’ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান একজন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে—যিনি নিচ থেকে পরিবর্তনের দাবি নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করতে আগ্রহী।







