বিএনপির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলটি এক সংকটময় মুহূর্তে প্রবেশ করেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। এর মাধ্যমে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পদটি শূন্য হয়ে যায়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি, দলীয় কার্যক্রমে তিনিই নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতৃত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থীদের প্রচারপত্রে কেবলমাত্র বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করা যাবে। ফলে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এই বিষয়ে দলের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে—প্রচারণায় তারেক রহমানের ছবি ব্যবহার করা হবে কি না, তা এখনো নির্ধারিত নয়। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
এদিকে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে সাত দিনের দলীয় শোক কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। প্রতিদিনই কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হচ্ছে। দলের নেতারা বলছেন, তারা এখনো শোকাহত অবস্থায় রয়েছেন, তবে সামনের নির্বাচনের প্রস্তুতিও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু হলেও মন থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নেতৃত্বের রদবদলের পাশাপাশি বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দমন। শতাধিক আসনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে একাধিক নেতা প্রার্থী হয়েছেন। এদের মধ্যে ইতোমধ্যে নয়জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম (নীরব) ও হাসান মামুন। দল জানিয়েছে, মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, না মানলে বহিষ্কারের তালিকা আরও বাড়বে। শরিকদের দেওয়া আসনগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে বিরোধী ঐক্য ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তারেক রহমানকে ঘিরে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল ও প্রচারণা পরিকল্পনা নির্ভর করছে। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে চেয়ারম্যান ঘোষণা না করা হলেও বাস্তবে দলের সব নির্দেশনা ও কৌশল তাঁর নেতৃত্বেই নির্ধারিত হচ্ছে। সময় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানান দলের নীতিনির্ধারকেরা। একইসঙ্গে তাঁর দেশব্যাপী সফরের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারে শেষ মুহূর্তে তাঁকে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দলীয় নেতাদের মতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তবে একই সঙ্গে মানুষের সহানুভূতি ও আবেগকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। জানাজা ও অন্তিম বিদায়ে জনতার বিপুল অংশগ্রহণ, দেশ-বিদেশের শ্রদ্ধা—এসব কিছু বিএনপির প্রচারণায় কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেও তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম যেন জীবিত থাকে, সেই বার্তা নিয়ে এগোতে চায় বিএনপি।







