আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা, অন্যদিকে রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার মাঝেই এখন দলটি লড়ছে দুই ফ্রন্টে—প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং দলের ভেতরের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ মুহূর্তে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দেওয়া।
বিশেষ করে বিএনপির ঐতিহ্যবাহী শক্ত ঘাঁটিগুলোতেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের তৎপরতা নেতৃত্বে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এই কোন্দলের ফলে ভোট বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন কমিশন ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার বিদ্রোহের মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় নেতাদের হুঁশিয়ারি ও নির্দেশনার পরেও অনেক নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ১১৫টি আসনে বিএনপির ১৯০ জনের বেশি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, যাদের অনেকেই দলটির জনপ্রিয় ও সংগঠিত ঘাঁটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এত সংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি কেবল দলকে বিভক্ত করবে না, বরং সাংগঠনিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে তুলবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়বে, যার প্রভাব সরাসরি ভোটের বাক্সে পড়বে। তার মতে, এখনই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে।
তবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সব স্বতন্ত্র প্রার্থীই বিদ্রোহী নন। অনেক ক্ষেত্রে এটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত—যেখানে দল জানে, আইনি জটিলতা বা প্রার্থিতা বাতিলের আশঙ্কা থাকায় বিকল্প হিসেবে কিছু প্রার্থীকে রাখা হয়েছে। তবে এর বাইরেও অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, যা এখন দলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্রোহীদের থামাতে বিএনপি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশে ইতোমধ্যে ৯ জন হেভিওয়েট নেতাকে বহিষ্কার করেছে দলটি। এসব নেতারা জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে দলীয় নির্দেশ অমান্য করে প্রার্থী হয়েছেন।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম নীরব, মামুনুর রশীদসহ আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা, যাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় সুসংগঠিত ও পরিচিত মুখ। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের নেতাদের বহিষ্কার দলীয় শৃঙ্খলার পক্ষে শক্ত বার্তা দিলেও তৃণমূলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, যারা ২০ জানুয়ারির মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে শর্তসাপেক্ষে যেসব বিদ্রোহী মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন, তাদের ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
জোটের শরিকদের জন্য যেসব আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানেও সমস্যা প্রকট। অনেক জায়গায় বিএনপির বিদ্রোহীরা জোটপ্রার্থীর বিপক্ষে দাঁড়ানোয় বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় জামিয়াত উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বিপাকে পড়েছেন। একইভাবে ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, সিলেট-৫ এ জামিয়াতের উবাইদুল্লাহ ফারুক, এবং ভোলা-১ এ বিজেপি চেয়ারম্যান পার্থ নিজ নিজ আসনে বিএনপির বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হচ্ছেন।
এমনকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকির বিপক্ষে একসাথে পাঁচজন বিএনপি নেতা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। নাটোর-১, ঝালকাঠি-১, কিশোরগঞ্জ-১, পটুয়াখালী-৩, রাজশাহী-৫, পঞ্চগড়-২, চট্টগ্রাম-১৪, কুষ্টিয়া-৪সহ বহু আসনে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
জোটের নেতারা এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নিজেদের নির্বাচনী সমন্বয় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন এবং তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এই পরিস্থিতিতে ঐক্য ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তাঁরা।
এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত কঠিন হলেও দলের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তা জরুরি ছিল। নজরুল ইসলাম খান বলেন, “সবাইকে তো মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব নয়। দল কারও প্রতি অবিচার করেনি, বরং সবাইকে একজোট হয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে মূল প্রতিযোগিতা জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি জামায়াত-এনসিপি জোটের জন্য বড় সুবিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে যেসব আসনে বিএনপি শরিকদের ছাড় দিয়েছে কিন্তু বিদ্রোহীরা সে সিদ্ধান্ত মানছেন না, সেখানে জামায়াত বা এনসিপির প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ সুবিধা পেতে পারেন। এই বিভাজনের সুযোগে তারা অনেক আসনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রাখে—যা দীর্ঘমেয়াদে বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সর্বশেষ, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ২০ জানুয়ারির মধ্যে বিদ্রোহীদের দমন করা। যদি তা না হয়, তবে আসন্ন নির্বাচনে দলের বড় ধরনের ভরাডুবি হতে পারে। এখন বিএনপি এক সংকটময় দ্বন্দ্বে—একদিকে বিদ্রোহীদের হটানো, অন্যদিকে জোটের অখণ্ডতা বজায় রাখা। এই দুইয়ের ভারসাম্য কতটা রক্ষা করতে পারবে দল, তার ওপরই নির্ভর করবে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।







