দেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের দ্বারপ্রান্তে—এমন সতর্কতা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। শুক্রবার নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, এটিকে তারা একশ বছরের মধ্যে দেশের ভেতরে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে বড় কম্পন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মাঝারি মাত্রার হলেও এই ভূমিকম্পে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মাটিতে ফাটল, ভবনে ফাটল ও ধসের ঘটনাও দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই প্রস্তুতি না নিলে বড় ধরনের মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষত ঢাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হতে পারে ভয়াবহ।
পৃথিবীর ভূগর্ভে টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ থেকে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন চাপ জমে থাকার পর প্লেটগুলো ধাক্কা খেলে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, যার শক্তির ওপর নির্ভর করে কম্পনের মাত্রা। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে যে ভূকম্পনটি অনুভূত হয়, সেটিও প্লেট সংঘর্ষের ফল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের আগে সাধারণত ছোট ছোট কম্পন ঘটে। আবার এসব কম্পন ভূগর্ভে জমে থাকা শক্তি কিছুটা কমিয়ে দিলেও সময়মতো বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আবহাওয়া অফিস দেশকে তিনটি জোনে ভাগ করেছে—অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুরের কিছু অংশ ও চট্টগ্রামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল বড় ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর বাইরে ডাউকি ফল্টের কারণে উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ–পূর্ব অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধাক্কার আশঙ্কায় আছে। ১৮৬৯ সাল থেকে দেশে ১৪টি বড় ভূমিকম্প হয়েছে, যার মাত্রা ৬.৬ থেকে ৮.৬ পর্যন্ত। ১৮৯৭ এবং ১৯৫০ সালের ভারতীয় ভূমিকম্পে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা, কুমিল্লা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জেলা মাঝারি ঝুঁকিতে এবং খুলনা–বরিশাল অঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১০০ বছরের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে মাধবদীর ভূকম্পনই সবচেয়ে বড়। এর আগের বড় কম্পন ছিল ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে—৭.৬ মাত্রার। তারা বলছেন, ১০০ থেকে ১৫০ বছর পর বড় ভূমিকম্প ঘুরে আসতে পারে এবং বাংলাদেশ এখন সেই সীমার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড না মানা এবং ঢাকায় বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বড় ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ হতে পারে। বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে শহরের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রাজধানীর অন্তত ২১ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিদর্শন ও সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বে ভূমিকম্প মোকাবিলায় সবচেয়ে সক্ষম দেশগুলোর একটি জাপান। পূর্বাভাস না পেলেও দেশটি ‘প্রি-ওয়েভ’ শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস–বিদ্যুৎ বন্ধ করা এবং বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করে ক্ষতি কমিয়ে আনে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশেও এ ধরনের নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে মানা জরুরি।
ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘরের ভেতর থাকলে মাথা বালিশ বা হাত দিয়ে ঢেকে শক্ত আসবাবের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। বারান্দা, জানালা, ভারী আসবাব ও ঝুলন্ত বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে। বাইরে থাকলে খোলা জায়গায় যেতে হবে। গ্যাস–বিদ্যুৎ লাইন দ্রুত বন্ধ করা এবং লিফট ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃত্যুহার বাড়ে আতঙ্ক, অবকাঠামোগত ঝুঁকি এবং আগুন লাগার মতো পারিপার্শ্বিক কারণগুলো থেকে। বাড়ি নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা, গ্যাস–বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা, ভারী আসবাবপত্র দেয়ালে আটকানো এবং জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রস্তুত রাখা জীবনহানি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।







