Home Bangladesh মামলার কথা শুনেই পালিয়ে যান ইন্সপেক্টর সোহেল রানা

মামলার কথা শুনেই পালিয়ে যান ইন্সপেক্টর সোহেল রানা

40
0

গ্রাহকের কয়েকশ’ কোটি  টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ই-অরেঞ্জের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু এসব মামলায় ই-অরেঞ্জের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও নেপথ্যের পরিচালক বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানার নাম ছিল না। গত মাসের শেষের দিকে রাসেল নামে ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় দশ নম্বর আসামি করা হয় শেখ সোহেল রানাকে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে গুলশান থানাকে নথিভুক্ত করে তদন্তের নির্দেশ দেন। গত ২ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় সেই মামলা নথিভুক্ত হয়। এই তথ্য জানার সঙ্গে সঙ্গেই পালিয়ে নেপাল যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি।

শনিবার (৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ভারতের চেংড়াবান্ধা সীমান্ত এলাকা থেকে শেখ সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর নর্থ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে বারোটায় স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ভারত হয়ে শেখ সোহেল রানা নেপালে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে বিএসএফ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ই-অরেঞ্জ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে গ্রাহকদের কাছ থেকে কয়েকশ’কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসার পরই শেখ সোহেল রানার নাম আলোচানায় আসে। এ ঘটনায় গুলশান ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পৃথক দুটি মামলাও দায়ের হয়। দুটি মামলায় শেখ সোহেল রানার বোন মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর গ্রেফতার  হলেও শেখ সোহেল রানা ছিলেন অধরা। মামলাতে তার নাম না থাকায় তিনি সবকিছু অস্বীকার করে আসছিলেন। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর দায়ের হওয়া একটি মামলায় তার নাম থাকার পরই বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি।

 সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ আগস্ট ১৬ জন গ্রাহকের পক্ষে মো. রাসেল নামে এক ব্যক্তি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।  মামলায় ৮৮ লাখ ৯৪ হাজার ৯১৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। শেখ সোহেল রানা ছাড়াও ওই মামলায় সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান, নাজনীন নাহার বিথি, আমান উল্লাহ, কাওসার, কামরুল হাসান, আব্দুল কাদের, নুরজাহান ইসলাম সোনিয়া ও রুবেল খানকে আসামি করা হয়। মুখ্য মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভুঁইয়া গুলশান থানা পুলিশকে মামলাটি রেকর্ড করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন।

মামলায় বাদী অভিযোগ করেন, বনানী থানার পরিদর্শক শেখ সোহেল রানাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে তিনি গত ১৮ আগস্ট গুলশান থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু থানা পুলিশ তার এজাহার গ্রহণ করেনি। তাই তিনি আদালতে মামলা দায়েরের আবেদন করেছেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ই-অরেঞ্জ নিয়ে সমালোচনা ও মামলা দায়ের হলে বিভিন্নভাবে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন শেখ সোহেল রানা। বোনের ব্যবসা হিসেবে মাঝে মধ্যে দেখাশোনা করলেও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনও সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর মামলা হওয়ার পর গ্রেফতার হতে পারেন এই আতঙ্কে বিদেশে পালিয়ে যান তিনি।

অভিযোগ আমলে নেয়নি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ

ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এবং এর সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা শেখ সোহেল রানার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তা আমলে নেয়নি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। একারণে তাকে বনানী থানা থেকে প্রত্যাহারও করা হয়নি। ডিএমপির গুলশান ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ই-অরেঞ্জ নিয়ে দুটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। কিন্তু কোনও মামলাতেই শেখ সোহেল রানাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ই-অরেঞ্জ সম্পর্কিত মামলার তদন্তে তারা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করেছেন। এতে ই-অরেঞ্জের একটি হিসাব থেকে শেখ সোহেল রানার কয়েক কেটি টাকা তুলে নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। এছাড়া ই-অরেঞ্জের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিথি সম্পর্কে শেখ সোহেল রানার স্ত্রী। বিথিও বিভিন্ন সময়ে ই-অরেঞ্জের ব্যাংক হিসাব থেকে কয়েক কোটি টাকা তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছেন। পুলিশ এখনো বিথিকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মো: আসাদুজ্জামান বলেন, ই-অরেঞ্জ নামের প্রতিষ্ঠানটি সোহেল রানার আপন বোন সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী  মাসুকুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে  সোহেল রানার সম্পৃক্ততার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। আমরা তদন্তে যারই সংশ্লিষ্টতা পাবো তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেবো।

বিপুল সম্পদের মালিক সোহেল রানা

গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শেখ সোহেল রানা তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের একটি অংশ ই-অরেঞ্জে বিনিয়োগ করেছিল বলে জানতে পেরেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

ওই সংস্থা তাদের অনুসন্ধানে শেখ সোহেল রানার বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্যও পেয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে ৪টি ফ্ল্যাট, একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানির ডিলারশিপ, কৃষি জমি, অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদসহ শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। শেখ সোহেল রানার চারটি ফ্ল্যাটের দুটি রয়েছে অভিজাত এলাকা নিকেতনে। টিঅ্যান্ডজি নামে তার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার একটি শাখা গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে ও আরেকটি উত্তরার গরীব-ই-নেওয়াজ এভিনিউয়ে। এছাড়া পূর্বাচলে তিন নম্বর সেক্টরে একটি প্লট, কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন একটি আবাসিক এলাকার ই এবং আই ব্লকে দুটি প্লট, খাগড়াছড়িতে রির্সোটের জন্যও জমি কিনেছেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here