ঢাকার সকালের চেহারা বদলে গেছে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই কুয়াশার ধোঁয়াটে চাদরে ঢেকে যায় পুরো নগরী। রাস্তায় জমে থাকা ঠান্ডা বাতাস চুপিচুপি এসে মানুষের গায়ে চেপে বসে। শীত সবার জন্য একরকম নয়—কারও কাছে এটি আরামের ঋতু, কারও কাছে কবিতার আবহ; কিন্তু গরিব মানুষের কাছে শীত মানে কষ্ট, বাড়তি খরচ আর দুশ্চিন্তার আরেক নাম।
কড়াইল বস্তির বউবাজার এলাকার ভেতরে একটি ছোট চায়ের দোকানে গরম স্টোভের পাশে দাঁড়িয়ে হাত সেঁকাচ্ছেন শ্রমজীবী শহিদুল ইসলাম। কাজের অপেক্ষায় আরও কয়েকজন শ্রমিকও সেখানে জড়ো হয়েছেন। শহিদুল বলেন, “ঠান্ডায় এক কাপ চা যেন জীবন বাঁচায় আপা। কিন্তু এখন কাজ কম, তাই চায়ের টাকাও হিসাব করে খরচ করতে হয়।” কথার মধ্যেই তার কণ্ঠে ধরা পড়ে অনিশ্চয়তার ছাপ। কয়েক দিন ধরে কাজ না থাকায় ঘরে খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে উঠেছে। তার কাছে শীত মানে কেবল ঠান্ডা নয়, বরং আয় কমে যাওয়া ও সংসার চালানোর চাপ আরও বেড়ে যাওয়া।
কারওয়ান বাজারের পাশের ফুটপাতে দিন কাটান নুরুল আলম নামে আরেক নির্মাণশ্রমিক। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে একটি পাতলা কম্বলে মুড়ে রেখেছেন তিনি। ঠান্ডা হাওয়ায় তার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ভেসে ওঠে যন্ত্রণার অনুভব—“রাতে এমন ঠান্ডা পড়ে, মনে হয় শরীরের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে যায়।” নিজের কষ্ট নয়, সন্তানদের ঠান্ডা থেকে বাঁচানোর চেষ্টাতেই তার চোখে ভেসে ওঠে উদ্বেগ।
নিম্নআয়ের মানুষের এই সংগ্রামে শীত যেন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সংকুচিত, বাতাস-বাহিত ঘরে, টিনের ছাদের নিচে তীব্র ঠান্ডা কাটানো আরও দুর্বিষহ। কড়াইল বস্তির একাংশে সম্প্রতি আগুন লেগে পুড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও করুণ হয়ে উঠেছে। সেখানে ঘুরে দেখা যায়—শিশুরা গায়ে জড়িয়েছে ছেঁড়া ও পাতলা জামা। পাঁচ বছর বয়সী শিখার মা রাশিদা বললেন, “বাচ্চার ঠান্ডা লেগেই থাকে। ওষুধ, গরম কাপড় লাগে। কিন্তু সেগুলোর আগে তো ভাত চাই।” কয়েকটি বাক্যেই উঠে আসে হাজারো পরিবারের বাস্তবতা।
ভোর হলে শহরের আলো জ্বলে ওঠে, আর তখনই চোখে পড়ে সবচেয়ে কষ্টে থাকা মানুষগুলো—রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, হকার, ঠেলাগাড়ি চালক—যাদের গায়ে থাকে পুরোনো সোয়েটার, সেলাই করা জ্যাকেট আর পাতলা কাপড়। তারা হেঁটে চলে কুয়াশার মধ্য দিয়ে, মুখে ধোঁয়ার মতো নিঃশ্বাস, চোখে এক চিলতে উষ্ণতার খোঁজ।
এই ঋতু শুধু ঠান্ডা নয়, সাথে নিয়ে আসে কাজ হারানোর ভয়, রোগের ঝুঁকি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তাদের কাঁপুনি কেবল আবহাওয়াজনিত নয়—জীবনের দুশ্চিন্তাও তাতে যুক্ত হয়। তারপরও প্রতিদিন সকাল হলেই তারা ঘুম ভেঙে কাজে বের হন, শহরকে সচল রাখেন তাদের ঘামে, অথচ সেই উষ্ণতা কখনো তাদের ঘরে পৌঁছায় না।
আমরা অনেকেই শীতের গল্প বলি গরম কাপড়, কফি কিংবা নরম কাঁথা দিয়ে মোড়ানো উষ্ণতায়। কিন্তু শহরের প্রান্তে যারা পড়ে আছেন—তাদের কাছে শীত মানে বেঁচে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম। এই শীত তাই শুধু আবহাওয়ার পালাবদল নয়, এটি এক শ্রেণির মানুষের নিঃশব্দ যুদ্ধের প্রতিচ্ছবি।







