সুদবিহীন গাড়িঋণ নেওয়া শুরু করলেন উপসচিবেরা

সুদবিহীন গাড়িঋণ নেওয়া শুরু করলেন উপসচিবেরা

50
0
SHARE

প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিবেরা ৩০ লাখ টাকা করে গাড়ি কেনার ঋণ নেওয়া শুরু করেছেন। অন্য ক্যাডারের সমমর্যাদার কর্মকর্তারা তা পাচ্ছেন না বলে তাঁদের মনে রয়েছে চাপা অসন্তোষ। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিলেও কোনো আশ্বাস পাচ্ছেন না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেট থেকে ১২৩ জন উপসচিবকে ঋণ দেওয়ার পরই এই খাতের জন্য বরাদ্দ থাকা টাকা শেষ হয়ে যায়। পরে গত মাসে বাজেটের থোক বরাদ্দ (অপ্রত্যাশিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা খাত) থেকে আরও ১০০ জনকে ঋণ দেওয়ার জন্য ৩০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।
‘বিশেষ অগ্রিম’ নামের এই ঋণের বিপরীতে কোনো সুদ দিতে হবে না। বরং ঋণের টাকায় কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, তেলের খরচ ও চালকের বেতন বাবদ সরকার তাঁদের মাসে আরও ৫০ হাজার টাকা করে দেবে। ঋণ পরিশোধের আগে সরকারের অনুমতি নিয়ে ওই সব গাড়ি বিক্রিও করা যাবে।
জানতে চাইলে অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবার টাকারই সংস্থান হবে পর্যায়ক্রমে।’ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের পর এ খাতে আরও টাকা ছাড় হতে পারে বলে জানান তিনি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত সেপ্টেম্বরে সরকারি চাকরিজীবীদের গাড়ি কেনাসংক্রান্ত তিনটি আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে গাড়ি কেনার ঋণের পরিমাণ ২৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করা হয়।
উচ্চপদের সরকারি চাকরিজীবীদের ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা’ বলা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিব এবং তাঁদের সমমর্যাদার কর্মকর্তারা। গত জুনে উপসচিবদেরও গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা পাওয়ার দিক থেকে ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ ঘোষণা করে সরকার।
গত ২৫ আগস্ট ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা ২০১৭ (সংশোধিত) ’ নামে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণ মঞ্জুরির আদেশ জারির পর থেকে অন্তত এক বছর ওই কর্মকর্তার চাকরি থাকতে হবে। ঋণের অর্থ সর্বোচ্চ ১২০টি সমান কিস্তিতে অর্থাৎ ১০ বছরের মধ্যে আদায়যোগ্য। ৩০ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা। ঋণ নেওয়ার পর প্রতি মাসের বেতন থেকে সরকার কিস্তির টাকা কেটে রাখবে। কেউ চাইলে এককালীন পরিশোধও করতে পারবেন। সরকারি কাজে দাপ্তরিক এলাকার আট কিলোমিটারের মধ্যে গাড়ি ব্যবহারের জন্য কেউ কোনো ভ্রমণ ভাতা ও খাওয়াদাওয়া (টিএ, ডিএ) খরচ পাবেন না।
তবে প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে বিসিএসের অন্য ক্যাডার সার্ভিসের ডিএস পর্যায়ের কর্মকর্তারা গাড়িঋণ পাচ্ছেন না। তাতে অন্য ক্যাডারের সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ইকোনমিকসহ বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে সরকারের এই নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের উপপ্রধান এবং আইন ও সংসদবিষয়ক বিভাগের উপসচিবদের গাড়ি কেনার ঋণ পাওয়ার সুযোগ থেকে পুরোপুরিই বাদ দেওয়া হয়েছে। ইকোনমিক ক্যাডারের যুগ্ম প্রধান বা তার ওপরের কর্মকর্তা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও সংসদবিষয়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব থেকে তার ওপরের পদের কর্মকর্তাদের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে নীতিমালায়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগ গত ২৫ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসনের সচিব মো. মোজাম্মেল হক খানের কাছে চিঠি দিয়ে বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের ২০ জন উপপ্রধানকেও গাড়িঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা আমলে নিয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতির জন্য পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রশাসনের উপসচিবদের মতো উপপ্রধানেরাও পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা। বিভিন্ন সময়ে সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা উপসচিব ও উপপ্রধানেরা সমভাবেই ভোগ করে আসছেন। এ ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা সমান হয়নি।
বিসিএস সমন্বয় কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নীতিমালাটিই ন্যায়ভিত্তিক হয়নি। প্রশাসন ক্যাডারের মতো অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরও ঋণ পাওয়া উচিত। একসঙ্গে সম্ভব না হলে সরকার তাঁদের পর্যায়ক্রমে ঋণ দিতে পারে। শুধু গাড়ি কেনার ঋণ নয়, পদোন্নতির ক্ষেত্রেও প্রশাসন ক্যাডারের তুলনায় অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মোট ১ হাজার ৫৩৯ জন উপসচিবের জন্য সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম খাতে ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করা হয়। সে অনুযায়ী অর্থ বিভাগ এই পর্যায়ে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে। অর্থমন্ত্রী তাতে সম্মতি দেওয়ার পরই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে টাকা ছাড় হয়।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইকোনমিক ক্যাডারের উপপ্রধানদের গাড়িঋণ দেওয়ার একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হলে অর্থমন্ত্রী তা নাকচ করে দেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY