ভারতে চীনা মোবাইল ও অ্যাপ বয়কটের হিড়িক

আন্দোলনের ডাকটা প্রথম দিয়েছিলেন সোনাম ওয়াংচুক। তিনি লাদাখের সেই বিখ্যাত প্রকৌশলী ও শিক্ষা সংস্কারক, যাকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল বলিউডের বিখ্যাত ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিতে আমির খানের রাঞ্চো চরিত্র। ইউনেসকো থেকে ম্যাগসাইসাই, দেশ-বিদেশের কত যে প্রতিষ্ঠান তাকে পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।.

সোনাম ওয়াংচুক লাদাখে বসে নিজের বার্তা রেকর্ড করছেন

চার-পাঁচদিন আগে লাদাখে বসেই একটি ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করেন এই ‘লিভিং লিজেন্ড’। জানান, তিনি নিজের বহুদিনের সঙ্গী চীনা মোবাইল ফোনটি ত্যাগ করছেন। শুধু তাই নয়, এক বছরের মধ্যে ‘মেইড ইন চায়না’ সব জিনিসপত্রই তিনি বর্জন করবেন। প্রত্যেক ভারতীয়কেই একই কাজ করার আহ্বানও জানান তিনি। লাদাখের নানা জায়গায় সীমান্ত বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে চীনা সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের জবাব ভারতের সেনারা যখন ‘বুলেট’ দিয়ে দেবেন, তখন সাধারণ নাগরিকদের উচিত ‘ওয়ালেট’ দিয়ে চীনকে জবাব দেওয়া–এ মন্তব্যও করেন তিনি। অর্থাৎ চীনা পণ্য বয়কট করলেই কেবল তারা সমুচিত বার্তা পাবে–সোজাসুজি সেটাই বলেছিলেন সোনাম ওয়াংচুক।

সোনামের সেই ডাক যেন ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ইউটিউবেই গত কয়েকদিনে ওয়াংচুকের বার্তা দেখেছেন সাড়ে তিন মিলিয়ন মানুষ, তাছাড়া টুইটার বা ইনস্টাগ্রামের মতো অন্য প্ল্যাটফর্ম তো আছেই। শাওমি, অপ্পো, ভিভো-র মতো অজস্র চীনা কোম্পানির মোবাইল ফোন ভারতে অসম্ভব জনপ্রিয়। কিন্তু রাতারাতি সেইসব ফোন বর্জনের অঙ্গীকার করতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ থেকে সেলিব্রেটিদের অনেকেই।

শুধু মোবাইল ফোনই নয়–চীনের সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্ক আছে, এমনসব অ্যাপ বয়কট করার ডাকও ভারতে তুমুল সাড়া ফেলতে শুরু করেছে। বাদ যায়নি টিকটকের মতো ভীষণ জনপ্রিয় অ্যাপও। গোটা ভারতে বারো কোটিরও বেশি মানুষ এই চটজলদি ভিডিও টুলটি ব্যবহার করে থাকেন। অনেকেই এখন টিকটক আনইনস্টল করতে শুরু করেছেন। এই তালিকায় আছেন মডেল ও তারকা মিলিন্দ সোমানের মতো ব্যক্তিত্বও।

আরও চমকপ্রদ হলো ‘রিমুভ চায়না অ্যাপস’ নামে একটি নতুন অ্যাপের কাহিনি। জয়পুরের স্টার্ট-আপ কোম্পানি ‘ওয়ানটাচঅ্যাপল্যাবস’ গত ১৭ মে এই অ্যাপটি লঞ্চ করে। এর কাজ হলো আপনার ফোন থেকে চীনা অ্যাপগুলো শনাক্ত করে সেগুলো সরাতে সাহায্য করা। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রায় বারো লাখ মানুষ এই অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন, এবং গুগল প্লে স্টোরে বিনা পয়সায় যেসব অ্যাপ পাওয়া যায় এই মুহূর্তে তার শীর্ষে আছে এই ভুঁইফোঁড় ভারতীয় অ্যাপটি।.

 

চীনা মোবাইল আর চীনা অ্যাপ বর্জনের ডাক ভারতে কী মারাত্মক সাড়া ফেলেছে তা সহজেই অনুমেয়। উল্লেখ্য, চীনের বেশ কয়েকটি অ্যাপ ভারতে তুমুল জনপ্রিয়। এর মধ্যে টিকটক ছাড়াও রয়েছে হেলো, শেয়ারইট, পাবজি, ইউসিব্রাউজারের মতো অসংখ্য অ্যাপ। কিন্তু এই প্রিয় ‘বন্ধু’দের সঙ্গে রাতারাতি সম্পর্কচ্ছেদ করতে লাখ লাখ ভারতীয় এখন বিন্দুমাত্রও ভাবছেন না।

এছাড়া যেসব ভারতীয় সংস্থায় বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আছে, সেগুলোও রোষের মুখে পড়েছে। অনলাইনে গ্রোসারি কেনাকাটার সাইট বিগবাস্কেট, ট্র্যাভেল সাইট মেকমাইট্রিপের মতো সংস্থা যেমন এই তালিকায় আছে–তেমনি আছে ভারতে ডিজিটাল পেমেন্টের জায়ান্ট পেটিএমও। এসব সংস্থা গত কয়েক বছরে ভারতীয়দের ডিজিটাল জীবনকে অনেক সহজ করে তুলেছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এখন তার বদলে খোঁজা হচ্ছে “শতকরা একশ’ ভাগ দেশি” বিকল্প!

ভারতে চীনা পণ্য বর্জনের ডাক অবশ্য নতুন নয়–প্রতিবারই দিওয়ালির আগে নতুন করে এই ডাক ওঠে, আরএসএসের মতো অনেক গোষ্ঠীর তাতে সমর্থনও থাকে। কিন্তু দিওয়ালির কেনাকাটা মিটে গেলে সেই ডাক আবার থিতিয়েও যায়। অর্থনীতিবিদ সৈকত সেনগুপ্ত মনে করেন, ‘লাদাখ বা সিকিম সীমান্তে যদি চীন-ভারত সংঘাত খারাপ মোড় নেয়, তাহলে কিন্তু এবারের চীন বয়কট আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হবে ধরেই নেওয়া যায়। কোভিড-১৯ সংকটের জন্য এদেশে বহু মানুষই চীনের ওপর বেজায় খাপ্পা হয়ে আছেন, সামরিক সংঘাত সেটাকে আরও জটিল করে তুলবে। দেশের সাধারণ মানুষ তার নিজের মতো করে এর বদলা নিতে চাইবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।’

নিজের মোবাইল থেকে টিকটক সরিয়ে ফেলেছেন মিলিন্দ সোমান

চীনা মোবাইল বা পণ্য বয়কটের ডাক দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে কি না, এই প্রশ্নও কিন্তু উঠেছে। গত রবিবার দ্বিতীয় একটি ভিডিও প্রকাশ করে লাদাখ থেকে সে প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছেন সোনাম ওয়াংচুক। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘চীনের নাগরিকদের সঙ্গে আমাদের কোনও শত্রুতা নেই। আমাদের প্রতিবাদ শুধু চীন সরকারের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে–যেখানে তারা লাখ লাখ শ্রমিককে নিজের দেশে ক্রীতদাসের মতো খাটাচ্ছে, মন্দির-মঠ ধ্বংস করে ফেলছে, তিব্বতের বৌদ্ধ বা উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে!’

চীনের ‘ডেট ট্র্যাপ’ বা ঋণের নাগপাশে জড়িয়ে শ্রীলঙ্কার মতো দেশ কীভাবে হাম্বানটোটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন সোনাম ওয়াংচুক। সেই সঙ্গেই পূর্বাভাস করেছেন, ‘পাকিস্তান যেভাবে চীনের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে তাতে তারা একদিন চীনের ক্রীতদাসে পরিণত হবে!’

Add Comment