কেভিন রাডের ই-পিটিশনে বাংলাদেশী ‘বটস’ নিয়ে ‘বিভ্রান্তিকর’ প্রতিবেদন নাকচ করে দিলেন বিশেষজ্ঞরা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাডের ই-পিটিশনে ১,০০০ ভুয়া স্বাক্ষর সরবরাহ করার জন্য ‘বাংলাদেশী বটস’ দায়ী- এ রকম দাবি করা হয়েছে দ্য অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদনে। এই অভিযোগটি নাকচ করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, এটি পুরোপুরি ‘জঘন্য’ এবং ‘প্রতিবেদন নয়’।
গতকাল দ্য অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রে একটি ‘এক্সক্লুসিভ’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যেখানে দাবি করা হয়েছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেডিন রাডের ই-পিটিশনে এক হাজারেরও বেশি ভুয়া স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশী ‘বটস’ কাজে লাগানো হয়েছিল। বলা হয়েছে, কোনো কোনো স্বাক্ষরকারীকে অর্থ প্রদান করা হয়েছিল এবং বিদেশ থেকেও স্বাক্ষর করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদনটিকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন।

মিস্টার রাডের সেই পিটিশনটিতে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম জগতে রয়্যাল কমিশন বসানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল। বিশেষভাবে, রুপার্ট মার্ডকের নিউজ কর্পোরেশন সাম্রাজ্যের প্রতি নজর দিতে বলা হয়েছিল। এই পিটিশনটিতে রেকর্ড-ভাঙ্গা ৫০০,০০০ এরও বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছিল।

দ্য অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রটির মালিক হলো নিউজ কর্প। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, একজন ‘হুইসেল-ব্লোয়ার’ (গোপন অপরাধ ফাঁসকারী) একজন বাংলাদেশীকে ৫৮ ডলার প্রদান করেছেন। সেই হুইসেল ব্লোয়ারের উদ্দেশ্য ছিল ’১২ ঘণ্টারও কম সময়ের মাঝে ১০০০ জাল স্বাক্ষরকারী তৈরি করতে পার্লামেন্টের ই-পিটিশন ব্যবস্থা কতোটুকু অরক্ষিত সেটা পরীক্ষা করা।’

কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনলজির ডিজিটাল কমিউনিকেশন এর অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. ড্যানিয়েল অ্যাঙ্গাস বলেন, দ্য অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রের প্রতিবেদনটি একটি ‘বিট-আপ’ (জঘন্য) এবং ‘কোনো সারবস্তু বিহীন’।

তিনি দ্য ফিড-কে বলেন,

“এখানে তাদের পরিষ্কারভাবে ব্যক্তিস্বার্থ আছে। তারা চেষ্টা করছে জনগণের মধ্যে অনেকের, যারা মার্ডকের প্রভাবের কারণে হতাশ, তাদের মত প্রকাশের বৈধতাকে দুর্বল করতে।”

ড. অ্যাঙ্গাসের অনুভূতির প্রতিফলন হতে দেখা যায় দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী, কেভিন রাড এবং ম্যালকম টার্নবুলের মাঝে। তারা দাবি করেন যে, নিউজ কর্পের ‘কোয়ালিশন বায়াস’ রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ মুদ্রণ-মাধ্যমের মালিকানা ভোগ করে রুপার্ট মার্ডকের মিডিয়া সাম্রাজ্য।

মিস্টার টার্নবুল মনে করেন, নিউজ কর্পের প্রকাশনাগুলো ‘প্রচারণার মাধ্যম’, বিশেষত, এগুলো যখন জলবায়ু ইস্যুটি ‘অস্বীকার’ করে।

এ বছরের শুরুর দিকে, মিস্টার টার্নবুল এবিসি-র ইনসাইডার্স-কে বলেন,

“সমাজে গণমাধ্যমের হাইপার-পার্টনারশিপের কারণে আমরা কী রকম মূল্য দিচ্ছি তা বের করতে হবে।”

দ্য অস্ট্রেলিয়ানের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়,

“তারা দু’জনেই ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে তাদের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ক্যু-তে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা উভয়েই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। তবে, তারা ক্ষমতা হারানোর জন্য নিউজ কর্প অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্রগুলোর প্রতি দোষারোপ করেন।”

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর মিস্টার রাড প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, প্রতিবেদনটিতে তাকে ‘বটস’ এর সাথে জড়ানো হয়েছে। (রবোটের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো বটস। এটি এক ধরনের সফটওয়্যার যা ইন্টারনেটে মানুষের বেশে কাজ করে।)

টুইটারে তিনি একে মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেন।

কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির ডিজিটাল মিডিয়ার সিনিয়র লেকচারার ড. টিমোথি গ্রাহাম বটস এবং মিসইনফর্মেশন নিয়ে গবেষণা করেন। দ্য ফিড-কে তিনি বলেন, প্রতিবেদনটিতে “রাডের বাংলাদেশী বটস” শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হলেও সেখানে এমন কোনো প্রমাণ তুলে ধরা হয় নি যা থেকে বলা যায় যে, কেভিন রাড কোনো বট-কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ড. গ্রাহাম মনে করেন, এর পরিবর্তে যে সমস্যাটির প্রতি অবশ্যই জোর দেওয়া প্রয়োজন তা হলো, “অস্ট্রেলিয়া সরকারের পিটিশন ওয়েবসাইটের কারিগরি অবকাঠামো”।

দ্য ফিড-কে তিনি বলেন,

“এই প্রতিবেদনটির শিরোনাম বিভ্রান্তিকর। কারণ, এটি এই প্রসঙ্গটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছে যে, হ্যাঁ, এসব ব্যবস্থা নিয়ে কিংবা যে কোনো সংখ্যক পিটিশন নিয়ে খেলা করা যায়।”

“এর একটাই প্রভাব, তা হলো নাম না জানা সেই ব্যক্তি, যে বিদেশে কাউকে অর্থ প্রদান করেছে।”

ড. অ্যাঙ্গাস বলেন, যে কোনো পিটিশন, বিশেষত, মিস্টার রাডের পিটিশনের মতো জনপ্রিয় অনলাইন পিটিশনগুলোতে ভুয়া সাবমিশন জমা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তিনি এটাকে ‘কোনো ঘটনা নয়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন,

“যে কোনো অনলাইন পিটিশনে এ জাতীয় ঘটনা ঘটে, যা মানুষ তৈরি করতে চায়।”

“যে পিটিশনে আধা মিলিয়ন মানুষ স্বাক্ষর করেন, তাতে দেখা যায়, ১০০০ বটস থাকা সত্ত্বেও, এটি অনেকের কাছেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইস্যু।”

সিস্টেম নিয়ে খেলা করা কতোটা সহজ?
ড. গ্রাহাম বলেন, প্রতিবেদনটিতে যেভাবে বলা হয়েছে, সিস্টেম নিয়ে খেলা করাটা ‘লো-টেক’। এটি ‘একটি সমন্বিত ষড়যন্ত্র নয়’।

“কঠোর নিয়ন্ত্রণের এবং ফিল্টারিং প্রক্রিয়ার অভাবের মানে হলো যদি কেউ অনেক চেষ্টা করে, তাহলে ভাসা ভাসা বাধাগুলো অতিক্রম করতে পারবে, ভিপিএন ব্যবহার করে এবং ভুয়া ইমেইল অ্যাড্রেস ও এ জাতীয় কিছু তৈরির মাধ্যমে।”

তবে, তিনি মনে করেন, পিটিশন সাইটগুলোর মতো অনলাইন সিস্টেমগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেগুলোতে কোনো বাধা থাকে না এবং লোকজন সহজেই অংশগ্রহণ করতে পারে।

“আপনি যদি বেশি বেশি অথেনটিকেশন লেয়ার যুক্ত করেন, আপনি যদি বৈধ পাসপোর্ট নম্বর কিংবা ড্রাইভার্স লাইসেন্স কিংবা এ জাতীয় কিছু চান, তাহলে আমি মনে করি আপনি মানুষের অংশগ্রহণ হারাবেন”, বলেন তিনি।

হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এর পিটিশন্স কমিটির চেয়ারম্যান কেন ও’ডওড দ্য অস্ট্রেলিয়ানকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করবে একটি কমিটি এবং প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Add Comment