অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ: ফিরে দেখা ২০১৮

ঘড়ির কাঁটা ঘুরে আর ক্যালেন্ডারের পাতা পাল্টে বিদায় হচ্ছে আরও একটি বছর। সময়ের সঙ্গে দৌড়ে ভবিষ্যতের রাস্তায় অতীত হয়ে যাচ্ছে বর্তমান ২০১৮ সাল। নানা ঘটনা-আয়োজন আর অভিজ্ঞতায় পূর্ণ ছিল সালটি। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের নানা অর্জন ও কর্মকাণ্ডেও ভরপুর ছিল বছরটি। ২০১৮ সালে দেশটিতে ঘটে যাওয়া তেমন কিছু বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি থাকছে এই প্রতিবেদনে।

অস্ট্রেলিয়া সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন

অস্ট্রেলিয়া সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অস্ট্রেলিয়া সফর

অস্ট্রেলিয়ায় এ বছর তিন দিনের সফরে এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এপ্রিলের ২৭ থেকে ২৯ পর্যন্ত গ্লোবাল সামিট অব উইমেন ২০১৮ শীর্ষক সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে সিডনিতে অবস্থান করেন তিনি। সম্মেলনে তাঁকে গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড সম্মাননা প্রদান করা হয়। সফরকালে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি। সফরের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ এবং বাংলাদেশিদের আয়োজিত গণসংবর্ধনায় অংশগ্রহণ।অস্ট্রেলিয়ায় জাতীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের বিল পাস

অস্ট্রেলিয়ায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস জাতীয়ভাবে পালনের বিল পাস হয় এ বছর। ফেব্রুয়ারি মাসেই এ ঘোষণা আসে। অস্ট্রেলিয়ার লেবার দলের সংসদ সদস্য ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের স্ট্যান্ডিং কমিটির উপপ্রধান ম্যাট থিসলেথওয়েটের এ বিল উত্থাপন করেন। দেশটির ফেডারেল সংসদে এ বিল উত্থাপিত হলে তাতে সম্মতি জানান সংসদ সদস্যরা। অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এমএলসি মুভমেন্ট ইন্টারন্যাশনালের দীর্ঘ দিনের বিলটি পাসের জন্য কাজ করে যাচ্ছিল।

বাংলাদেশি গবেষক আবু সিনা

বাংলাদেশি গবেষক আবু সিনা
স্বল্প সময়ে ক্যানসার শনাক্তে বাংলাদেশির অবদান

পৃথিবীর বহু গবেষণাকেন্দ্রে ক্যানসার শনাক্ত ও নির্মূলে প্রতিষেধক আবিষ্কারে নানা গবেষণা চলছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ন্যানো টেকনোলজির একদল গবেষক সব ধরনের ক্যানসারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ইউনিভার্সেল ক্যানসার বায়ো মার্কারকে শনাক্ত করার একটি সহজ পদ্ধতির আবিষ্কার করেছেন। আর ১২ জনের গবেষক দলটির অন্যতম সদস্য অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি গবেষক ড. আবু আলী ইবনে সিনা। তাঁদের গবেষণার ফল খুব স্বল্প সময় ও খরচে যেকোনো ধরনের ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। উদ্ভাবনটি বর্তমানে প্রাথমিক অবস্থায় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অপেক্ষায় রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় সমাদৃত বাংলাদেশি

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন খাতে অবদান রাখার জন্য এ বছর বাংলাদেশিদের বেশ সুনাম ছড়ায়। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যের ডারউইনে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসে চার্লস ডারউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি তরুণ শিক্ষার্থীরা। নিজ উদ্যোগে দুর্যোগ কবলিত এলাকার প্রায় ৪০০ জন মানুষের খাবার সরবরাহ করে তাঁরা। বাংলাদেশিদের মানবিকতার এমন দৃষ্টান্তের পাশাপাশি নিজের কর্মেও বাংলাদেশিদের সুনাম তুলে ধরেছেন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসক ডা. রেজা আলী। দেশটির নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য সরকার কর্তৃক আয়োজিত প্রিমিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০১৮-তে স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রদান করা হয় ব্ল্যাকটাউন হাসপাতালের জরুরি বিভাগকে। হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এ পুরস্কার দেওয়া হয়। আর ব্ল্যাকটাউন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পরিচালক ও সহকারী অধ্যাপক ডা. রেজা আলী। তাঁর সুপরিসর পরিকল্পনার মাধ্যমে জরুরি বিভাগকে এমনভাবে সাজানো হয় যার মাধ্যমে জরুরি বিভাগে রোগীর অবস্থানের সময় গড়ে ৮০ মিনিট কমে যায়। ডা. রেজার জরুরি বিভাগকে পুরস্কার প্রদান করেন নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী গ্ল্যাডিস বেরেজিক্লিয়ান।

অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেটপ্রেমী জাতি বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ছেলে মাহদি ইসলাম। গত ৬ অক্টোবর অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগের জুনিয়র ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলের শিরোপা জয়ে বিশেষ অবদান রাখে মাহদি। দলের হয়ে মাহদি খেলেছে অলরাউন্ডার হিসেবে। সেরা পারফরম্যান্স ও শৃঙ্খলার জন্য ‘জুনিয়র অ্যাম্বাসেডর’-এর পদকও জেতে সে। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য দল ভিক্টোরিয়া একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়মিত ক্রিকেট খেলে মাহদি।

অস্ট্রেলিয়ায় আলো ছড়ানো বুলবুল-পুত্র

অস্ট্রেলিয়ায় আলো ছড়ানো বুলবুল-পুত্রঅন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশনের উপদেষ্টা বাংলাদেশি সাবরিন ফারুকি উশ্রি। সিডনির ব্যাংকসটাউন এলাকায় বিশেষ অবদানের জন্য গেল বিশ্ব নারী দিবসে রাজ্যের বর্ষসেরা নারী পুরস্কার ২০১৮ অনুষ্ঠানে নির্বাচিত ‘বর্ষসেরা নারী’ পুরস্কারে সমাদৃত করা হয় তাঁকে। সাবরিন অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। পাশাপাশি, বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে বিভিন্ন বাংলাদেশি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।

তরুণ বাংলাদেশিদের মর্মান্তিক মৃত্যু

ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ মিলিয়েই মানুষের জীবন। সুখের পাশাপাশি নানা দুঃখের স্মৃতিও জুড়েছে এ বছর অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশিদের মনে। ২০১৮ সালে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। বছরের শুরুতেই সিডনির মালগুয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাইফ শেখ। মার্চে কাকাডু ন্যাশনাল পার্কে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন চার্লস ডারউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম দিনার, সাদেকা কামাল নিপা ও মাইশা কুদ্দুস। গত সেপ্টেম্বরে সিডনির দক্ষিণে ক্লিফটনে পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে নিহত হন নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনোয়ার সরকার অনীক। অক্টোবরে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের ক্যালবেরি পর্বত আরোহণের সময় পানিশূন্যতায় মারা যান পার্থের মারডক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ময়ূখ মুজাহিদ। নভেম্বরে সিডনির ওয়াটামোলা সমুদ্র সৈকতে ডুবে গিয়ে শিক্ষার্থী রাহাত বিন মোস্তাফিজের প্রাণহানি ঘটে। সবশেষে বিদায়ী মাস ডিসেম্বরেই চিরবিদায় নেন শিক্ষার্থী সাদ আহমেদ সাদমান। পশ্চিম সিডনিতে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী সাদমান ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়া জুড়ে আরও কয়েকজন বাংলাদেশির মৃত্যু শোকাবহ করে তোলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের।

অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের নামে ইস্যুকৃত জাল ভিসা

অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের নামে ইস্যুকৃত জাল ভিসা
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি জাল ভিসার ছড়াছড়ি

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের জাল ভিসা তৈরির ঘটনা ঘটেছে। ভুয়া ভ্রমণ ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয়প্রার্থী প্রায় ২১ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তবে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেই ভিসা ভুয়া হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। অস্ট্রেলিয়ায় একদল বাংলাদেশির হাতে লেখা ভিসা জালিয়াতি করছে বলে নিশ্চিত করে অস্ট্রেলিয়ার কানবেরাস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন ও বাংলাদেশের ঢাকা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ঢাকায় এখন অস্ট্রেলিয়ায় মেশিন রিডেবল ভিসা প্রদান করা হচ্ছে।

পুরস্কার হাতে সাবরিন ফারুকি (মাঝে)

পুরস্কার হাতে সাবরিন ফারুকি (মাঝে)
প্রবাসীদের ভোট প্রদানে সরকারি নির্দেশনা জারি

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রবাসীদের ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনেক বছর ধরেই দেশে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গত ৩০ নভেম্বর পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নির্দেশনা দেয় নির্বাচন কমিশন। তবে এ বছরই এর বাস্তবিক কোনো ফল না দেখা গেলেও প্রবাসীদের ভোট প্রদানের পদ্ধতি চালু হওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করেন অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

অস্ট্রেলিয়ার নতুন কর্ম ভিসা চালু ও ভিসা প্রক্রিয়া বেসরকারিকরণের প্রস্তাব

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকারের সীমিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন সংক্রান্ত সকল ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা করে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল। পরবর্তীতে গত নভেম্বরে সেই উদ্যোগের কথা পুনর্বিবেচনায় আনে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। সরকারের এই উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে ভিসা প্রক্রিয়া বেসরকারি করা হলে ভিসার খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আর এতে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হতে পারে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক রেজা আলী

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক রেজা আলীএ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় কর্ম ভিসা সাবক্লাস ৪৫৭ বাতিলের ঘোষণা আসে ২০১৭ সালে। তবে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয় এ বছর। এ ভিসার পরিবর্তে নতুন যাত্রা শুরু হয় সাবক্লাস ৪৮২ ভিসার। বাতিল হওয়া ভিসার সঙ্গে নতুন ভিসার বেশ কিছু মিল থাকলেও আবশ্যিক শর্তে আনা হয় বড়সড় পরিবর্তন। এ ভিসায় বাংলাদেশিসহ প্রচুর বিদেশি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী বিচারকেরা

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী বিচারকেরা
বাংলাদেশি বিচারক ও পুলিশদের প্রশিক্ষণ

এ বছর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ থেকে পুলিশ ও বিচারকেরা বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় যোগ দেন। শুরুতে গত এপ্রিলে ১৪ দিন দিনব্যাপী অপরাধমূলক তদন্ত মনিটরিং ও তত্ত্বাবধান বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণে আসেন বাংলাদেশ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ২০ জন কর্মকর্তা। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী দলটি নেতৃত্ব দেন পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। এরপর গত অক্টোবরে ১১ দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় আসেন পিবিআইয়ের আরও ১৯ জন কর্মকর্তা। দলটির নেতৃত্ব দেন ডিআইজি আবু হাসান মুহাম্মদ তারিক। নভেম্বরে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশের আইন ও বিচার বিভাগের নিম্ন বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রায় দুই সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মাশালার আয়োজন করা হয়। পর্যায়ক্রমে ৯০০ জন বাংলাদেশি বিচারক এতে অংশ নেওয়ার কথা। বিচারকদের প্রথম দলটির নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রামের জেলা আদালতের জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হুসনে আরা। এ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য রাজ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অংশ নেন।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশিদের নাম

অস্ট্রেলিয়ায় পৃথক দুটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে দুজন বাংলাদেশির জড়িত থাকার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে। ৫৬ বছর বয়সী এক অস্ট্রেলিয়ানকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরিকাঘাত করার দায়ে আটক করা হয় বাংলাদেশি ছাত্রী মোমেনা সোমাকে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি জঙ্গি বা চরমপন্থী সংস্থার ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সন্ত্রাসী হামলা ঘটান মোমেনা। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে মোমেনা তাঁর সঙ্গে আইএসের যোগসূত্র রয়েছে বলে স্বীকার করে। মোমেনার বিরুদ্ধে আনা মামলার এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

এরপর গত ১৬ জুন সিডনি থেকে ২৬ বছর বয়সী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুবক নওরোজ রাইদ আমিনকে আটক করে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের যুগ্ম কাউন্টার টেররিজম দল। চরমপন্থী মতাদর্শ সমর্থনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে বাংলাদেশে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়। চরমপন্থী মতাদর্শকে সমর্থন করে এমন পোশাক ও অন্যান্য জিনিসপত্র থাকার দায়ে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আসার সময় তাঁর ভ্রমণের অনুমতি রদ করে দেয় সিডনি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০১৭ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) সাদিয়া আমিন নামে তিরিশ বছরের এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করে। র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সাদিয়া আমিন অস্ট্রেলিয়ানিবাসী নওরোজ আমিনের স্ত্রী।

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ সুফিউর রহমান

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ সুফিউর রহমান
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে নতুন হাইকমিশনার যোগ দিয়েছেন এ বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের রুটিন কাজের অংশ হিসেবে এ বছর ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন মোহাম্মদ সুফিউর রহমান। এর আগে ২০১৫ সাল থেকে হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করছিলেন কাজী ইমতিয়াজ হোসেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার গভর্নর জেনারেল পিটার কসগ্রোভারের কাছে পরিচয়পত্র পেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন মোহাম্মদ সুফিউর রহমান।

সিডনিতে বৈশাখী মেলা

সিডনিতে বৈশাখী মেলা
বাঙালিদের মেলা

উৎসবপ্রিয় জাতি হিসেবে এ বছর বাংলাদেশিদের নানা উদ্‌যাপনে বড় বড় মেলার আয়োজন করতে দেখা যায়। এ বছর এর ধারাবাহিকতা শুরু হয় নতুন বছর উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে। সিডনির ব্যাংকসটাউনে পল কিটিং পার্কে জানুয়ারিতে আয়োজিত হয় কালারস অব বাংলাদেশ মেলা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও অমর একুশ উদ্‌যাপন উপলক্ষে আয়োজিত হয় একুশে বইমেলা। সিডনির অ্যাশফিল্ড পার্কে এ মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। মার্চে ভিক্টোরিয়া রাজ্যের মেলবোর্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মবার্ষিকী ও শিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত হয় এক শিশু কিশোর মেলা। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাঙালিপাড়া খ্যাত লাকেম্বার পেরি পার্কে এবং ওয়ালিপার্কে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন মেলার আয়োজন করা হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালিদের উদ্‌যাপিত সবচেয়ে বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ। এ উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া জুড়ে আয়োজিত হয় মেলার। প্রতিবারের মতো এবারেও সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলার আসর বসে বিখ্যাত এএনজেড অলিম্পিক স্টেডিয়ামে। বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া কর্তৃক আয়োজিত এই মেলায় হাজার হাজার বাঙালি অংশ নেন। এর আগে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে টেম্পি পার্কে আয়োজিত বৈশাখী মেলার এবারের আসর বসে সিডনির ফেয়ারফিল্ডের শো গ্রাউন্ডে। গত অক্টোবরে ব্যাংকসটাউন পল কিটিং পার্কে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল।

সিডনিতে দেবীর প্রদর্শনীতে জয়া আহসান

সিডনিতে দেবীর প্রদর্শনীতে জয়া আহসান

ঈদকে কেন্দ্র করেও মেলার আয়োজন করে বাংলাদেশিরা। জুনে লাকেম্বার ইউনাইটিং চার্চ প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। আগস্টে সিডনির মিন্টোতে ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুল প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব। ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উপলক্ষেও মেলা বসে অস্ট্রেলিয়া জুড়ে। অন্য মেলার সঙ্গে সিডনির ওয়ালিপার্কে দিনব্যাপী চলে বিজয় দিবসের বাংলা মেলা। বিজয় দিবসে ২৫টিরও বেশি দেশের প্রায় দুই হাজার দর্শক নিয়ে বহু সাংস্কৃতিক বিজয় মেলার আয়োজন করে সাউথ অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশি কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশন (সাবকা)। সেন্ট হেলেনস পার্কের মেলা প্রাঙ্গণে ১০টি দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজেদের সংস্কৃতি তুলে ধরে মেলায়।

বাংলা মঞ্চনাটক ও সিনেমার সাফল্য

প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চর্চা ছিল চোখে পড়ার মতো। এরই ধারাবাহিকতায় অস্ট্রেলিয়ায় এ বছর নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখে মঞ্চনাটক ও বাংলা সিনেমা। অস্ট্রেলিয়ায় প্রদর্শিত প্রায় প্রত্যেকটি মঞ্চনাটক ও বাংলা সিনেমা প্রচুর দর্শক আকর্ষণ করেছে। বছরের শুরুতে মঞ্চায়িত হয় সুন্দরবনের নিকটবর্তী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে রচিত মঞ্চনাটক ‘প্রেম পুরান’। সিডনির ওয়ালিপার্কে হরাইজন থিয়েটারে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করা হয় নাটকটি। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন রাজন নন্দী।

মে মাসে সিডনির ব্যাংকসটাউনের ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটারে মঞ্চায়িত হয় বাংলাদেশের সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটক কঞ্জুস। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন সিডনিপ্রবাসী নাট্যজন শাহীন শাহনেওয়াজ। এরপর ব্যাপক দর্শক অনুরোধে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আবারও মঞ্চায়িত হয় নাটকটি।

গত ১০ নভেম্বর দীর্ঘ ষোলো বছর পর অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে মঞ্চায়িত হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত মঞ্চনাটক লিভ মি অ্যালন। সিডনিতে মঞ্চনাটকটি প্রথম মঞ্চায়িত হয় ২০০২ সালে। এ বছর মঞ্চনাটকটি আরও বেশ কয়েকবার মঞ্চায়িত হয় নাটকটি। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন জন মার্টিন। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন গোলাম মোস্তফা ও মৌসুমী মার্টিন।

সিডনিতে মঞ্চ নাটক

সিডনিতে মঞ্চ নাটকবছরের শেষ সময়ে গত ২৩ ডিসেম্বর মঞ্চায়িত হয় মঞ্চনাটক রিফিউজি বিভ্রাট। সিডনির ব্যাংকসটাউনের ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটারে নাটকটি পরিবেশন করা হয়। ইন্দোনেশিয়া থেকে ট্রলারে করে অস্ট্রেলিয়ায় আসা একদল শরণার্থীদের সমুদ্র যাত্রা ও বেআইনিভাবে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস শুরু করার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে নাটকটি। নাটক রচনা ও নির্দেশনা করেছেন বেলাল হোসেন ঢালী।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলা সিনেমার জয়জয়কার দেখা যায় ২০১৮ সালে। মনপুরা খ্যাত নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম নির্মিত স্বপ্নজাল সিডনির অবার্নে রিডিং সিনেমাস প্রেক্ষাগৃহে ব্যাপক বাংলাদেশি দর্শক আকর্ষণ করে। বছরের শেষ প্রান্তিকে আসে জয়া আহসান অভিনীত ‘দেবী’। আর এসেই রেকর্ড পরিমাণ হলে চলে সিনেমাটি।বছরের শেষ মাসে সিডনিতে চলছে সিয়াম অভিনীত বাংলা চলচ্চিত্র ‘দহন’। এ ছাড়া, আরও অনেক বাংলাদেশি চলচিত্র দেশটির বিভিন্ন রাজ্যের হলে প্রদর্শিত হয়।

Add Comment