একুশে ফেব্রুয়ারি কীভাবে এল

পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশে তখন এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর কারণ যেমন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি নিয়ে ছাত্র-যুবসমাজে শাসকবিরোধী মনোভাবের বিস্তার, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা-সংকট, যা সমাজের প্রায় সব শ্রেণীকেই কমবেশি স্পর্শ করেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকা সফরে আসেন। ২৭ জানুয়ারি (১৯৫২) পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানকে আমরা এছলামী রাষ্ট্ররূপে গঠন করিতে যাইতেছি।…প্রাদেশিক ভাষা কি হইবে তাহা প্রদেশবাসীই ঠিক করিবেন, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে উর্দু’ (দৈনিক আজাদ, ২৮ জানুয়ারি ১৯৫২)।

উদু‌র্ভাষী খাজা সাহেবের কাছে হয়তো তাঁর কথা অযৌক্তিক বলে মনে হয়নি। কারণ, মুসলিম লীগের রাজনীতিকদের বিচারে পাকিস্তান ইসলামি রাষ্ট্র; সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উদু‌র্র যোগ্যতাই তো সবচেয়ে বেশি। কিন্তু পূর্ববঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন পূর্ব-অভিজ্ঞতা স্মরণ থাকলে হয়তো তিনি এমন মন্তব্য করার আগে তিনবার ভাবতেন। উর্দুর পক্ষে মূলনীতি কমিটির সুপারিশ স্থগিত করার কথাও ভাবতেন। কিন্তু এসব বিষয় আমলে আনেননি প্রধানমন্ত্রী।

মৌচাকে ঢিল ছোড়ার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে ৩ ফেব্রুয়ারি সম্ভবত কারও পরামর্শে সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি বিষয়টি হালকা করতে চেষ্টা করেন; অবশ্য মূল বক্তব্য থেকে সরে না এসে। জিন্নাহ সাহেবের ঢাকা সফরকালীন বক্তৃতা উল্লেখ করে খাজা সাহেব বলেন যে তিনি ‘কায়েদে আযমের মতামত উল্লেখ করেছেন মাত্র। কারণ, তিনি কায়েদের নীতিতে দৃঢ়বিশ্বাসী। তবে এ বিষয়ে গণপরিষদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’ একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে এ বিষয়ে যারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাইবে, তারাই পাকিস্তানের দুশমন। ঠিক এ ধরনের কথা ঢাকায় বসে জিন্নাহ সাহেবও বলেছিলেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জানতেন না যে আটচল্লিশ সাল আর বায়ান্ন সাল পরিস্থিতি বিচারে এক নয়। চার বছরে বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেছে। তাদের অপশাসন পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে রাজনীতিনিরপেক্ষ সাধারণ ছাত্ররাও তখন ভাষার দাবি নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। বাংলা রাষ্ট্রভাষা তাদেরও দাবির অন্তভু‌র্ক্ত। আর সে জন্যই খাজা সাহেব বুঝতে পারেননি যে তাঁর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পরদিন থেকেই অঘটনের পাথর গড়াতে শুরু করবে।

ওই পাথর গড়ানোর প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রতিবাদ সভার অনুষ্ঠান, ৩০ জানুয়ারি সব শিক্ষায়তনে ধর্মঘট এবং ছাত্র এলাকায় স্লোগানমুখর মিছিল—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ উচ্চারণ বাতাসে উত্তাপ ছড়াতে থাকে। ওখানেই শেষ নয়। ৩১ জানুয়ারি (১৯৫২) ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মী সম্মেলনে সরকারবিরোধী সব দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। মূল উদ্দেশ্য পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা। ৪০ সদস্যের ওই পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন কাজী গোলাম মাহবুব।

সংগ্রাম পরিষদের তৎপরতার অপেক্ষায় না থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটি, যুবলীগ এবং বিভিন্ন কলেজ ইউনিয়নের মতো একাধিক ছাত্র সংগঠন কাজে নেমে পড়ে। আর তাতে অভাবিত সাড়াও মেলে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্রসভায় ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল দেশব্যাপী হরতাল, সভা, শোভাযাত্রা এবং ঢাকায় অ্যাসেম্বলি (আইন পরিষদ) ঘেরাও। উদ্দেশ্য আইন পরিষদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের জন্য প্রস্তাব পাস করানো। এই ছিল অ্যাসেম্বলি ঘেরাওয়ের তাৎপর্য।

৪ ফেব্রুয়ারি সভা শেষে ১০-১২ হাজার ছাত্রছাত্রীর বিশাল মিছিল রাজপথ ঘুরে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের বাসভবন বর্ধমান হাউসের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান তোলে: ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না’, ‘ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র চলবে না’। লক্ষ করার বিষয় যে ছাত্রদের এ মিছিলে বেশ কিছুসংখ্যক সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ শ্রেণীর মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। ছাত্রসভার এ সিদ্ধান্ত সমর্থন করে এই দিনই সর্বদলীয় পরিষদের সভায় প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং মওলানা ভাসানী ওই কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার বিরুদ্ধে বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ সভার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবি বায়ান্ন সালে পৌঁছে এতটা ব্যাপক হয়ে উঠেছিল যে ঢাকার জন্য নির্ধারিত কর্মসূচি ঢাকার বাইরে একাধিক শহরে অধিকতর উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালিত হয় (সাপ্তাহিক ইত্তেফাক , ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে আন্দোলনের জন্য ক্ষেত্র প্রস্ত্তত। দরকার সরকারের পক্ষ থেকে আরেকটি অদূরদর্শী পদক্ষেপ। মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ও তাঁর অবাঙালি-প্রধান প্রশাসন তখনকার পরিস্থিতি একেবারেই বুঝতে পারেনি। বাংলা ভাষার দাবি কতটা ব্যাপক, কতটা ছাত্র-জনতার মন স্পর্শ করেছে, তা তাদের জানা ছিল না।

একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করার জন্য ঢাকায় বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মতৎপরতা শুরু হওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শহরের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগেরও চেষ্টা চলে। উদ্দেশ্য একটাই: বাংলা রাষ্ট্রভাষার অধিকার আদায়। এ কাজে যুবলীগ, ছাত্রাবাসগুলোর নেতা-কর্মী এবং বামপন্থী ছাত্র-যুবনেতারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সঙ্গে ছিল রাজনীতি-সচেতন ছাত্রসমাজ। এদের চেষ্টায় একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় জীবনের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় দিন হিসেবে উঠে আসতে পেরেছিল।

Add Comment