সিডনির বুকে একখণ্ড সবুজ বাংলাদেশ

শৈশবের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমি বড় হয়েছি এমন একটি গ্রামে, যেখানে বিদ্যুৎ বা টেলিভিশন ছিল না। তাই আমার তখনকার প্রত্যেকটা দিন ছিল প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। প্রতিদিন সকালে উঠেই বাড়ির বড়দের সঙ্গে চলে যেতাম মাঠে। তারপর সারা দিন খেতে কাটিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে আসতাম। মাটির প্রকার অনুযায়ী বিভিন্ন জমিতে বিভিন্ন রকমের সবজি চাষ করা হতো। কোনোটাতে উচ্ছে, পটল বা মরিচ আবার কোনোটাতে বাঙ্গি, তরমুজ বা ধুন্দুল। প্রত্যেকটা খেতই ছিল আলাদাভাবে সুন্দর। বীজ থেকে ছোট গাছ, একসময় সেই গাছে ফুল তারপর ফল। বাঙ্গির খেতে বাঙ্গি পাকা শুরু করলে অনেক দূর থেকেও সেই ঘ্রাণ পাওয়া যেত। আর পটলের গাছ হতো পটলের শাখা থেকে। সেটা হাট থেকে কিনে নিয়ে এসে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে মাটিতে লাগানো হতো। এই সব কিছুই ছিল আমাদের সাদামাটা শৈশবে উত্তেজনার উপকরণ।

মাঝেমধ্যে আমি নিজে খেত পাহারা দেওয়া লোকদের কাছে বায়না ধরতাম তাদের কুড়ে ঘরের মধ্যে থাকার জন্য। সেটা ছিল একটা অন্য অভিজ্ঞতা। কুড়ে ঘরের মধ্যে শুয়ে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে আর তারা গুনতে গুনতে একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতাম। বেশ বড় হওয়ার পর শহরতলিতে বসবাস শুরু করলেও সেই সব স্মৃতি আমার মস্তিষ্ক খুব সযত্নে তুলে রেখেছিল।

ফার্মের সবজিফার্মের সবজিপরবর্তীতে ভেবে রেখেছিলাম, আমার সন্তানদেরও আমি আমার শৈশবের সেই সব স্মৃতির কিঞ্চিৎ ছোঁয়া দিয়ে হলেও বড় করব। আমার যখন এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সময় হলো তখন আমরা জীবনজীবিকার প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ায়। আমার প্রথম সন্তান তাহিয়ার জন্ম বাংলাদেশে। আর দ্বিতীয় সন্তান রায়ানের জন্ম অস্ট্রেলিয়ায়। তার জন্মের আগেই আমরা চলে আসি অস্ট্রেলিয়ায়। বসবাস শুরু করি সিডনিতে। এখন অস্ট্রেলিয়ায় এই খেত আমি কোথায় পাব। আমি খেতের সন্ধান করছি এটা আমার পরিচিত অনেকে জানতেন। তাদেরই একজন একদিন আমাকে রামিন ফার্মের সন্ধান দিলেন। এ ফার্মের সন্ধান পেয়ে আমি আমার ইচ্ছার কথা গিন্নিকে জানালাম। সঙ্গে সঙ্গেই গিন্নি রাজি হয়ে বলল, ভালোই হলো, ছেলেমেয়েদের কৃষি ফার্ম দেখিয়ে ওখান থেকে কিছু তরতাজা শাক সবজিও আনা যাবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। এক শনিবার সকালে মেয়ে তাহিয়া আর ছেলে রায়ানকে নিয়ে আমি রামিনস ফার্মে হাজির হলাম। তাহিয়া আর রায়ান খোলা জায়গা পেলেই খুশি হয়। তার ওপর ওখানে ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন প্লটের মধ্যে বিভিন্ন শস্য দেখে খুশিতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। আমি পরিচিত হলাম রামিনস ফার্মের স্বত্বাধিকারী হারুন ভাইয়ের সঙ্গে। তার মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগে থাকে। ঠিক যেমন বাংলাদেশের কৃষকের মুখে হাসি লেগে থাকে সুখে দুঃখে সারাক্ষণ। হারুন ভাই বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের মানুষ। অস্ট্রেলিয়া এসে ইউনিভার্সিটি অব ওলোংগং থেকে ম্যানেজমেন্টে অনার্স-মাস্টার্স করে পেইন্টার হিসেবে কাজ করেন। শখের বসে ২০১৬ সালে তিনি ও তার দুজন বন্ধু মিলে সাড়ে চার একর জমির ওপর ফার্মটা শুরু করেছিলেন।

রামিনস ফার্মের স্বত্বাধিকারী হারুন ভাইয়ের (বাঁয়ে) সঙ্গে লেখক

 

রামিনস ফার্মের স্বত্বাধিকারী হারুন ভাইয়ের (বাঁয়ে) সঙ্গে লেখকউল্লেখ, অস্ট্রেলিয়ার খুব কম মাটিই চাষাবাদের উপযোগী। বেশির ভাগ মাটিই পাথুরে। কৃষি ফার্ম শুরু করার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও তারা কোনো লাভের মুখ দেখেননি। বরং পয়সা খরচ করে ফার্মের দেখাশোনা করতে হতো। সংগত কারণেই হারুন ভাইয়ের দুই বন্ধু ফার্মের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু হারুন ভাই লেগে থাকেন। তিনি ফার্মিং খুবই উপভোগ করেন। ওদিকে হারুন ভাইয়ের সহধর্মিণীর কষ্ট হলেও তিনি এই ব্যাপারটা মেনে নিলেন।

অস্ট্রেলিয়ায় কর্মদিনে মানুষ এতই ব্যস্ত থাকেন যে কারও নিশ্বাস ফেলার সময় থাকে না। ছুটির দিনগুলোতে কর্মজীবী সবাই পরিবার ও বাচ্চাদের সঙ্গে কাটান। কিন্তু হারুন ভাই সেটা না করে সেই সাত সকালে তার খেতে চলে যান। ছুটির দিন পরিবারকে সময় না দিয়ে সকালে অবার্নের বাসা থেকে লেপিংটনে ফার্মে চলে আসেন তিনি। অবার্ন থেকে লেপিংটনে যেতে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ড্রাইভ করতে হয়। তবুও তিনি হার মানার পাত্র নন। পরে অবশ্য তিনি পাশে পেয়েছেন আরও কিছু বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী। তারা বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন একবার দেশে বাবা অসুস্থ হলে হারুন ভাইকে বেশ কিছুদিনের জন্য দেশে যেতে হয়েছিল। তখন তারা খেতে পানি দেওয়ার কাজটা করে দিয়েছিলেন।

সবুজ খেতে তাহিয়া ও রায়ান

সবুজ খেতে তাহিয়া ও রায়ানরামিনস ফার্মের জায়গাটা আমাদের পরিবারের সকলেরই খুবই পছন্দ হয়ে গেল আর সেই সঙ্গে হারুন ভাইয়ের মিষ্টি ব্যবহার। সব মিলিয়ে রামিনস ফার্মে গেলেই আমাদের মনটা ভালো হয়ে যায়। আমি খেতের প্রত্যেকটা প্লট দেখি আর নিজের শৈশবে হারিয়ে যাই। ফার্মের মাঝ বরাবর একটা পায়ে হাঁটার রাস্তা আর তার দুই পাশে বিভিন্ন সবজির প্লট। সেখানে আছে কাচা মরিচ, লাল শাক, পুঁই শাক, কচুর শাক, উচ্ছে, বেগুন, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো, বাঙ্গির খেত। আর আছে লাউয়ের মাচা। লাউয়ের কথা আলাদাভাবে বলতে হবে কারণ, সিডনিপ্রবাসী অনেক বাংলাদেশির কাছে তার খেতের লাউ এখন সবচেয়ে প্রিয় সবজি। দুই পাশের খেত পার হয়ে একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলে সেখানে রয়েছে একটা খাল। সেই খালে সারা বছরই কম বেশি পানির প্রবাহ থাকে। সেই খালেই আমি সিডনিতে প্রথমবারের মতো খুদে পানা দেখতে পেলাম আর হোগলার বন। সেখান থেকেই সেচের বেশির ভাগ পানির জোগান আসে।

মরিচের খেত

মরিচের খেতরামিনস ফার্মে গেলে সবচেয়ে খুশি হয় রায়ান। কারণ সেখানে নিয়মিত সেচ দেওয়ার ফলে মাটি থাকে নরম। সেই নরম মাটিতে হেঁটে বেড়ানো রায়ানের সবচেয়ে পছন্দের একটি কাজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই রায়ানের জুতা নরম মাটিতে ভারী হয়ে যায়। তখন সেটা খুলে দিলে সে আরও খুশি মনে কাদার মধ্যে হাঁটা শুরু করে। রায়ানের কর্মকাণ্ড আমি বেশ উপভোগ করি। হারুন ভাইয়ের ছোট ছেলেও রায়ানের বয়সী। নাম রাকিন। সেও রায়ানের মতো বেশ দুষ্টু। অবশ্য তার বড় ছেলে, যার নামে এই ফার্মের নামকরণ, সে কিছুটা শান্ত। আর সবার ছোট মেয়ে আইজাও শান্ত স্বভাবের। রামিন-রাকিন সুযোগ পেলেই হারুন ভাইয়ের সঙ্গে খেতে চলে এসে বাবার সঙ্গে কাজে লেগে পরে। আমার মেয়ে তাহিয়াও খুশি হয়। কারণ সে আমার সঙ্গে মাঝেমধ্যে খেতে নেমে পড়ে লাল শাক ও পুঁই শাক তুলতে। আমি কেটে দিই আর ও সেটা ওর হাতে ধরা ব্যাগে রাখে। এ ছাড়া আমি গ্রামের ছেলে বলে খেতের মধ্যে আগাছা হিসেবে হওয়া আরও কিছু শাক আবিষ্কার করেছি। যেমন বৈথা শাক, নোনতা শাক ইত্যাদি।

রামিনস ফার্ম নিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। শনিবার এলেই তাহিয়া জিজ্ঞেস করতে থাকে আমরা আজ রামিনস ফার্মে যাব কিনা। এ ফার্ম সাধারণত শনিবার সকালে খোলা থাকে। সিডনিপ্রবাসী কেউ যদি তরতাজা সবজি একেবারে খেত থেকে সঠিক দামে পেতে চান তাহলে চলে যান লেপিংটনের রামিনস ফার্মে। এই ফার্মে গিয়ে আমি বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যারা আমাদের মা-বাবার বয়সী। তারা এসেই খেতের মধ্যে বসে পড়েন ধুলো ময়লার পরোয়া না করে। দৃশ্যটার মধ্যে এমন একটা অকৃত্রিমতা আছে যে আমি আর চোখ ফেরাতে পারি না। তবে রামিনস ফার্মে গেলে খেতে ঢোকার আগে হারুন ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে নেওয়া ভালো। কারণ খেতের মধ্যে আমি বিছুটি গাছ দেখেছি। যেটা কারও গায়ে লাগলে ভয়ংকর চুলকানি শুরু হবে। আর হারুন ভাই বললেন, তিনি একদিন একটা বড় সাপও দেখেছেন।

Add Comment