প্রবাসীর একুশের ভাবনা

বহু ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ অস্ট্রেলিয়া সব ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং সেগুলো রক্ষা করার ব্যাপারে সব সময়ই সচেষ্ট থাকে। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীরা তাঁদের দেশের জাতীয় উৎসবগুলো পালন করেন যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগাম্ভীর্যে। বাংলাদেশিরাও তাদের দেশের জাতীয় দিবসগুলো পালন করে যথাযোগ্য মর্যাদায়। তবে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষিত হওয়ার পর সেটা পালন করা হয় আরও ভালোভাবে।

সিডনির অ্যাশফিল্ড পার্কে নির্মাণ করা হয়েছে একটি শহীদ মিনার। সেখানে একুশে ফেব্রুয়ারির কাছাকাছি কোনো এক শনি বা রোববার দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বইমেলার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের আদলে সকালে প্রভাতফেরির মাধ্যমে বিভিন্ন সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে দিনটি শুরু করেন। তারপর চলতে থাকে একে একে বিভিন্ন সংগঠনের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। সিডনির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেখানে দিনব্যাপী মানুষ আসেন শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বই কেনার জন্য। লোকসমাগম দেখে মনে হয় এ যেন বাংলা একাডেমিরই ছোট্ট একটি অংশ। আমরা থাকি সিডনির একেবারে দক্ষিণ–পশ্চিম প্রান্তে। তবুও প্রতিবছর নিয়ম করে অ্যাশফিল্ড পার্কের শহীদ বেদিতে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসি।

লেখকের বাড়ির আঙিনায় অস্থায়ী শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনলেখকের বাড়ির আঙিনায় অস্থায়ী শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনএ ছাড়া আমাদের বাসার পাশেই ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুলে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগাম্ভীর্যে একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন রকমের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুল প্রতি রোববার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী বাচ্চারা বাংলা ভাষা শেখার পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতির চর্চা করে থাকে। আর বিশেষ দিবসগুলো পালনের জন্য থাকে তাদের আলাদা প্রস্তুতি। ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুলের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয় দ্য গ্র্যাঞ্জ পাবলিক স্কুলের ক্যাম্পাসে। সেখানে কোনো স্থায়ী শহীদ মিনার নেই। তার অভাব পূরণ করা হয় কাঠের তৈরি ভ্রাম্যমাণ শহীদ মিনার দিয়ে। খুব সকালে সেখানে আশপাশের এলাকার বিভিন্ন সাবার্বের (এলাকা) মানুষ জড়ো হতে থাকেন। তারপর তাঁরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের সঙ্গে খালি পায়ে স্কুল ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে ভ্রাম্যমাণ শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। তারপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। চলে বিকেল পর্যন্ত।

এভাবে শহীদ দিবস পালন করার পরও মনের মধ্যে একটা ভাবনা কাজ করে যাচ্ছিল, কীভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিতেই আমরা যথাযোগ্য মর্যাদায় ভাষাশহীদ দিবস পালন করতে পারি। কারণ এখানে কর্মদিবসগুলোতে কাজ শুরু করতে হয় সেই সাতসকালে। তাই সকালে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। আর অত সকালবেলা বাচ্চারা উঠতেও একটু ঝামেলা করে। তাই ভাবলাম কাজ থেকে ফিরে কিছু করা যায় কি না? ভাবনাগুলো আমার মেয়ে তাহিয়ার সঙ্গে শেয়ার করতেই সে বলল, ‘বাবা, আমরা বাংলাদেশে যেভাবে শহীদ মিনার বানাতাম সেভাবে শহীদ মিনার বানিয়ে পালন করতে পারি।’

আমরা বাংলাদেশে থাকতে একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে শহীদ মিনারের উদ্দেশে রওনা দিতাম। তারপর শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে সারা দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটিয়ে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরতাম। আর যেবার শহীদ মিনারে যেতে পারতাম না সেবার আমরা বাসার ছাদে ইট, কাগজ আর ফুল দিয়ে ভ্রাম্যমাণ শহীদ মিনার বানিয়ে শ্রদ্ধা জানতাম। একবার উত্তরার একটা পার্কের পাশের শিমুলগাছের তলা থেকে শিমুল ফুল কুড়িয়ে নিয়ে এসে আমরা আমাদের হাতে তৈরি শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলাম।

অ্যাশফিল্ড পার্কে শহীদ মিনারঅ্যাশফিল্ড পার্কে শহীদ মিনারযাহোক, এবার একুশে ফেব্রুয়ারির দিন কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। কাপড় বদলে আমি আর তাহিয়া আমাদের বাসার সামনের ড্রপওয়ালের ওপর ইট দিয়ে শহীদ মিনার বানানোর কাজে লেগে গেলাম। আমাদের দেখে ছোট্ট রায়ানও এসে হাত লাগল। অবশ্য সে কাজ এগিয়ে না দিয়ে নষ্টই করে যাচ্ছিল। তাই আমার গিন্নি এসে রায়ানকে কোলে নিয়ে তার হাত থেকে আমাদের নিস্তার আর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রকারের বুদ্ধি দিয়ে আমাদের সাহায্য করে গেল। আমাদের কাজকর্ম দেখে তাহিয়ার বান্ধবী জেইনার মা ফাহিমা জেইনা আর ছোট জাহিয়াকে নিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। আর আমাদের বাড়িওয়ালা নাজমুল ভাই আর সন্ধ্যা ভাবিও আমাদের অনেক উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঘণ্টাখানেকের পরিশ্রমে আমরা একটা সুন্দর শহীদ মিনারের মডেল দাঁড় করিয়ে ফেললাম। তাহিয়া তার রঙিন কাগজ কেটে একটা সূর্য বানিয়ে শহীদ মিনারের সঙ্গে সেঁটে দিল। আমি একুশ লেখা কাগজ কেটে সেটাকে বেদিতে বসিয়ে দিলাম। আমাদের তৈরি করা শহীদ মিনারটা দেখতে অবিকল আসল শহীদ মিনারের মতো হলো।

এরপর আমরা মোবাইলের ইউটিউবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটা ছেড়ে দিয়ে একটু দূর থেকে খালি পায়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে এসে শহীদ বেদিতে একে একে সবাই শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করলাম। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আমরা সেখানে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম এবং একুশে ফেব্রুয়ারির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করলাম। তারপর রাত গভীর হলে যে যার ঘরে ফিরে গেলাম। আমি আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের ছবি ফেসবুকে দেওয়ায় সবাই খুব পছন্দ করলেন এবং বললেন, পরেরবার এমন আয়োজন করলে যেন আগে থেকে তাঁদের জানাই। তাহলে তাঁরাও এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারবেন। এরপর আমাদের সেই ভ্রাম্যমাণ শহীদ মিনারটা সেখানেই ছিল। অবশ্য পরে বৃষ্টিতে কাগজগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আগামী বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতেও আমরা এ বছরের মতো ইট দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পরিকল্পনা করে রেখেছি। আশা করি এভাবেই আমরা এখন থেকে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবস পালন করতে পারব।

ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুলে অস্থায়ী শহীদ মিনারক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুলে অস্থায়ী শহীদ মিনারএখানে বলে রাখা দরকার আমরা যখন অস্ট্রেলিয়া আসি তখন আমার মেয়ে তাহিয়ার বয়স ছিল পাঁচ বছর। তখন আমরা উত্তরখানে থাকতাম। তাহিয়া স্থানীয় একটা স্কুলে নার্সারিতে পড়ত। তাই অস্ট্রেলিয়া এসে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার পরও বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার প্রতি তার অগাধ মমতা কাজ করে। আমি একদিন তাকে ইংরেজিতে পড়া বোঝাতে গিয়ে সে বলল, বাবা, তুমি বাংলায় বলো, আমি বাংলা বুঝি। এই কথাটা শুনে খুবই ভালো লেগেছিল। প্রতিবছর শহীদ দিবস সমাগত হলেই সে শহীদ মিনারের ছবি এঁকে আমাদের দেখায়। ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুলের সহায়তায় সে এখন বানান করে বাংলাটাও পড়তে পারে। শুধু যুক্তাক্ষরগুলো একটু সমস্যা তৈরি করে। এ ছাড়া বাংলা স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সে ছড়া আবৃত্তি করে থাকে। খুশির কথা হচ্ছে এখনো বাংলা উচ্চারণ স্পষ্ট। সেটাতে ইংরেজির টান আসেনি। আশা করি, বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার প্রতি ওর এই আগ্রহ ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে।

প্রবাস জীবনে আপনি চাইলেই অতি সহজে এভাবে আপনার পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। তাহলে বড় হয়ে আর তারা শিকড়হীন পরিচয়হীনতায় ভুগবে না। আর একবার ওদের মধ্যে মমত্ববোধ তৈরি হয়ে গেলে গুগল ইউটিউবের মাধ্যমে বাকিটা নিজেরাই এগিয়ে নেবে।

মো. ইয়াকুব আলী: সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ই–মেইল: <[email protected]>

Add Comment