সিডনিতে এক টুকরো উৎসবের বাংলাদেশ

গত বছর থেকে সিডনির বাঙালি পল্লিখ্যাত লাকেম্বার রেলওয়ে প্যারেডে শুরু হয়েছে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে বাংলাদেশের আদলে রাস্তায় আলপনা করার বিষয়টি। সুদূর সিডনিতে বসেও যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাংলা পঞ্জিকার প্রথম দিনটা বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখের আদলে পালন করতে পারে, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এই আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর বর্তমান প্রজন্মও ক্ষণিকের জন্য স্মৃতিতে ফিরে যায় বাংলাদেশে ফেলে আসা পয়লা বৈশাখের সর্বজনীন উৎসবে। আমাদের জন্য সেটা ছিল একটু বিশেষভাবে স্মৃতিকাতরতার। কারণ আমাদের সবেমাত্র চার বছর হয়েছে দেশ ছেড়ে আসার।

দেশে আমার জীবনের কয়েক বছর কেটেছে ঢাকায়। তখন পয়লা বৈশাখেই আমরা খুব ভোরে উঠে চলে যেতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে। শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতাম। সেটা শেষ হলে বুয়েটের স্থাপত্য বিল্ডিংয়ের সামনের খোলা জায়গাটা ছিল আমাদের গন্তব্য। সেখানে ঘাসের ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রতিকৃতি বানানো হতো। পাশাপাশি থাকত বিভিন্ন ধরনের খেলার ব্যবস্থা। সেখানে নাগরদোলা থেকে শুরু করে বাঁদর খেলা দেখার ব্যবস্থা থাকত। আর বিল্ডিংয়ের সামনের কংক্রিটের মেঝেতে করা হতো দৃষ্টিনন্দন আলপনা। এমনকি বিল্ডিংয়ের সামনের পোর্চেও বিভিন্ন প্রতিকৃতি বানানো হতো। পয়লা বৈশাখে এটা ছিল আমাদের নিয়মিত কাজের রুটিনের মতো।

সিডনিতে আসার পর দেখলাম, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বেশ কয়েকটা মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশনা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রাও করা হয়। কিন্তু কোথাও আলপনা করা হয় না। তাই মনে মনে খুবই মিস করছিলাম আলপনার বিষয়টাকে। গত বছর যখন খবর পেলাম, লাকেম্বাতে রাস্তায় আলপনা করা হবে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেটা দেখতে যাওয়ার। কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণে আর সেটা হয়ে ওঠেনি। তাই এবার আর সেটা সামনাসামনি দেখার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছিলাম না। এবার পয়লা বৈশাখ অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল দিনটা পড়ে গেল রোববার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই মনে মনে খুশিই হলাম কারণ লাকেম্বাতে পয়লা বৈশাখের দিনই নববর্ষ উৎসব পালন করা হয়। অন্যরা সাধারণত কাছাকাছি কোনো তারিখে সেটা পালন করে থাকেন। রোববার হওয়ায় সকাল সকাল সেখানে গিয়ে আলপনাতে হাত লাগানোর একটা পরিকল্পনা করে ফেললাম। কিন্তু গিন্নি বললেন, রোববার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত তো মেয়ের বাংলা শেখার স্কুল আছে। তখন পড়লাম উভয়সংকটে।

সাংস্কৃতিক উৎসবে সমবেতদের একাংশ

সাংস্কৃতিক উৎসবে সমবেতদের একাংশআমি চাই না মেয়ে বাংলা স্কুল মিস দিক। আবার এটাও চাই না, আলপনা করার বিষয়টা না দেখুক। শনিবার রাতে আমাদের এক বাসায় দাওয়াত ছিল। সেখানে কথায় কথায় বললাম রোববার আমাকে দুবার লাকেম্বাতে যেতে হবে। শুনে আমার গিন্নি বললেন, ‘আপনি একটু বেশি বেশি করেন।’ আমি বললাম, সারা জীবন আমি এই আদেখলাপনা করে যেতে চাই। যদিও মনে মনে একটু দমে গেলাম এবং সকালবেলা লাকেম্বা যাওয়ার পরিকল্পনাটা মোটামুটি বাদই দিয়ে দিলাম। কিন্তু মেয়েকে অনেক আগেই বলে রেখেছিলাম রোববার সকাল আটটায় উঠতে, যাতে আমরা লাকেম্বা গিয়ে আলপনা করায় হাত লাগিয়ে এসে আবার বাংলা স্কুলে যেতে পারি। মেয়ে সকালে উঠেই আমাকে তাগাদা দিতে লাগল। তখন উৎসাহ পেয়ে তৈরি হতে শুরু করলাম। ইতিমধ্যেই ছোট রায়ানও উঠে পড়েছে। তাই তাকেও সঙ্গে নেওয়াটা স্থির করলাম। অবশেষে আমার গিন্নিও উঠে আমাদের দলে যোগ দিলেন।

গাড়িতে উঠেই অনেক খুঁজে একটা সিডি পেলাম, যেটার গায়ে লেখা ফিডব্যাক ও কায়া। কিন্তু বাজাতে গিয়ে দেখি সেটা বঙ্গাব্দ ১৪০০ ও কায়ার গানের একটা মিশ্র গানের সিডি। সেটাতে মেলায় যাইরে গানটা নেই। অবশেষে মোবাইলের সঙ্গে কর্ড লাগিয়ে মোবাইলের মেমোরিতে থাকা ‘মেলায় যাইরে’ গানটা ছেড়ে দিলাম। সেটা যাতে বারবার বাজতে পারে, তাই রিপিট অ্যাগেইন দিয়ে রাখলাম। গাড়ি এম৫ রাস্তায় ওঠার পর মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি জানো মেলায় যাইরে গানের মানে হচ্ছে ‘লেটস গো টু ফেয়ার, লেটস গো টু ফেয়ার’। শুনে মেয়ে বলল, ‘বাবা আমি বাংলাটাই বুঝেছি, কারণ আমি এখনো বাংলাদেশি।’ শুনে খুবই ভালো লাগল। এরপর আমরা অনেক জোরে গান বাজিয়ে লাকেম্বার উদ্দেশে এগিয়ে চললাম।

রেলওয়ে প্যারেডে পার্কিং পাওয়াটা একটু মুশকিল ছিল। কিন্তু তখন অনেক সকাল বলে কাছাকাছি একটা পার্কিং পেয়ে গেলাম। গাড়ি পার্ক করে আমি রায়ানকে কাঁধে নিলাম। তাহিয়া আর তার মা আমাদের পেছনে হেঁটে চলল। লাকেম্বা স্টেশনের ঠিক বিপরীতে রেলওয়ে প্যারেডের রাস্তাটা গ্রামীণ চটপটি রেস্তোরাঁর কোনা থেকে শুরু করে অপর দিকে হেলডন স্ট্রিট পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ রেস্তোরাঁর সামনেই মঞ্চ সাজানো হয়েছে। তার সামনে থেকেই শুরু হয়েছে আলপনা। সেটা শেষ হয়েছে স্টেশনে যাওয়ার পথচারী পারাপার হওয়ার ইটের জেব্রা ক্রসিংয়ে। তারপরই লেখা হবে ‘শুভ নববর্ষ’ কথাটা। কাছাকাছি যেতেই দেখি আমার পরিচিত আরিফ ভাই ও অন্য একজন আলপনাতে শেষ আঁচড় দিচ্ছেন। আরিফ ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, তাঁরা বাংলাদেশের আদলেই ঠিক ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে আলপনা আঁকার কাজ শুরু করেছেন। সকাল ১০টার মধ্যেই শেষ করে ফেলবেন। তারপর দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেটা শুকানোর জন্য রাখা হবে। দুপুরের পর থেকে শুরু হবে বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। যেখানে যেখানে রং একটু হালকা, সেখানে সেখানে রং দিচ্ছেন আর কিছু কিছু গ্যাপেও নতুন করে রং দিচ্ছেন। আমরা যেতেই তিনি আমাকে আর তাহিয়াকে তুলি ধরিয়ে দিয়ে বলে দিলেন, কী করতে হবে। আমরা খুঁজে খুঁজে হালকা রঙের লাইনগুলোকে গাঢ় করা শুরু করলাম। আমাদের দেখাদেখি আমার গিন্নিও হাত লাগলেন। তিনি নিজেও অনেক সুন্দর আলপনা করতে পারেন। রায়ান আমার কাঁধ থেকে নামতেই চাইছিল না। একপর্যায়ে আমাদের উৎসাহ দেখে সেও এসে হাত লাগল।

এর ফাঁকে ফাঁকেই কথা হচ্ছিল গ্রামীণ চটপটির আশরাফ ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ভাইয়া এটাই তো আসল আনন্দ। কোনো কিছু নিজের হাতে করা। আপনি বাচ্চাদের নিয়ে সকাল সকাল এসে খুবই ভালো করেছেন। তাহলে ওরা যখন বড় হবে তখন নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে এগুলো করবে। এই আয়োজনের অন্যতম সংগঠক ক্যান্টাবুরি কাউন্সিলের বাংলাদেশি কাউন্সিলর নাজমুল ভাই বললেন, ‘ভাইয়া একদম ঠিক করেছেন। গতবার যখন শুরু করি, তখন কাউন্সিল থেকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাদের বুঝিয়ে রাস্তায় রং দিয়ে আলপনা করার অনুমতি নিতে হয়েছিল। এবার অবশ্য তেমন একটা কিছু বলতে হয়নি। আর আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে পুরো রেলওয়ে প্যারেডই আলপনা করার। আপনাদের অংশগ্রহণই পারে সেটাকে সফল করতে।’

সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল। বাসায় ফিরে আবার বাংলা স্কুলে যেতে হবে। তাই আমাদের একসময় থামতে হলো। ইতিমধ্যেই দেখি মিন্টো থেকে ফরিদা ভাবিও চলে এসেছেন আলপনা দেখতে। তাঁকে বললাম আমাদের কিছু ছবি তুলে দিতে। তিনি আমাদের দারুণ কিছু ছবি তুলে দিলেন। তুলি রেখে দেওয়ার পর দেখি, আমাদের সবার হাতেই যে যে রঙের তুলি ধরেছিলাম সেই রঙের ছাপ। আমরা ইচ্ছে করেই সেটা আর ধুয়ে ফেললাম না। রঙের ছাপগুলো দেখে একটা অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিল মনের মধ্যে। মনে হচ্ছিল যেন আমাদের মনেই আসলে সেই রঙের ছাপটা লেগেছে। এত সুন্দর একটা আয়োজনের সামান্যতম অংশ হতে পেরেও মনের মধ্যে একটা ভালো লাগার বোধ কাজ করছিল। বিকেলে তো সবাই আসবে পয়লা বৈশাখ পালন করতে, কিন্তু আমরা মাত্র কজনই সকালের আরামের ঘুম নষ্ট করে আলপনা করতে এসেছিলাম।

বছরের প্রথম দিনের বাহারি পোশাকে একদল তরুণ

বছরের প্রথম দিনের বাহারি পোশাকে একদল তরুণপ্রতিটি উৎসবই পূর্ণতা পায় একাধিক মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে। সিডনির বুকেও বাংলাদেশের আদলে এই আলপনা করার প্রক্রিয়াটা অনেক বাংলাদেশির চেষ্টার ফসল। আর এই চেষ্টার সঙ্গে আমি আমার বাচ্চাদের যুক্ত করতে পেরে অনেক খুশি হলাম। আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিভিন্নজন বিভিন্ন কারণে আজ দেশান্তরি। কিন্তু প্রত্যেকের মনের কোণেই এক টুকরো বাংলাদেশ এখনো অনেক বেশি জলজ্যান্ত। আমরা অনেক সময় অনেক কারণে বাংলাদেশের অনেক কিছু নিয়ে গালমন্দ করলেও দিন শেষে আমরা যে বাংলাদেশি, সেটা স্বীকার করতে সব সময়ই গর্ববোধ করি। কারণ আমাদের আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতি। আর প্রবাসে সেই সংস্কৃতির চর্চা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কালে কালে পথ দেখিয়ে যাবে। আর অস্ট্রেলিয়া যেহেতু প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর ঐতিহ্যকে সংরক্ষণে সচেষ্ট, তাই বাংলাদেশের ঐতিহ্যগুলোও কখনোই হারিয়ে যাবে না।

যা হোক, একসময় আমাদের ফেরার সময় হয়ে এল। নিজেদের শৈশবের গ্রামের পয়লা বৈশাখের ছোট মেলার কথা মনে পড়ে গেল, যেটাকে আমরা বলতাম আড়ং। বছরের প্রথম দিনে মা-চাচিরা গোবর আর ধানের তুষ মিশিয়ে একটা গোলা তৈরি করে মাটির ঘর-দুয়ার লেপতেন, যাতে করে সারা বছর বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, তখন এমন একটা ধারণা ছিল। গ্রামের মুদিখানা দোকান, যেখান থেকে আমরা সারা বছর বাজার করতাম, সেখানে বছরের প্রথম দিনে হতো হালখাতা। প্রায় সময়ই আমাকে টাকা নিয়ে গিয়ে সেই হালখাতায় উপস্থিত হতে হতো। দোকানের পাশেই অস্থায়ী চুলায় গরম-গরম জিলাপি ভেজে কাগজের ঠোঙায় করে আমাদের দেওয়া হতো। বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই গরম-গরম গুড়ের জিলাপির দু-একটা আমার উদরে আশ্রয় নিত। হিন্দু কাকি মায়েরা তাঁদের উঠোনের ঠিক মাঝখানে এমনকি ঘরের দেয়ালেও আতপ চালের গুঁড়া দিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর আলপনা করতেন। অবশ্য তাঁরা সব সময়ই আমাদের এক দিন পর পয়লা বৈশাখ পালন করতেন। আর আমাদের কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় পয়লা বৈশাখকে বলা হয় ‘পয়লা বোশেখ’। সিডনির রাস্তার এই আলপনা করতে এসে আজ সবই মনে পড়ে যাচ্ছিল। এবার আমরা গাড়িতে উঠে ‘মেলায় যাইরে’ গানটা না ছেড়ে সিডিটা ছেড়ে দিলাম। তখনই কায়ার কণ্ঠে বেজে উঠল মরমি ফকির শাহ আবদুল করিমের সেই বিখ্যাত গানটা—

‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
আমরা আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’

Add Comment