সিডনিতে পথিক ৯৮-এর শীতকালীন পিঠা উৎসব

পিঠা বাংলাদেশের শাশ্বত ঐতিহ্যের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। স্বাদ ও পুষ্টি মানে অনন্য এই পিঠা আমাদের শিকড় ও অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে নিবিড়ভাবে। বাঙালির উৎসব-আয়োজন আর আপ্যায়নে পিঠাপুলির উপস্থিতি অবিচ্ছেদ্য। দেশ ছেড়ে এসে এই সুদূর প্রবাসে পিঠার স্বাদ থেকে আমরা বঞ্চিত থাকি। সেই অপূর্ণতাকে পরিপূর্ণতা দিতেই প্রবাসে বিভিন্ন সংগঠন পিঠা উৎসবের আয়োজন করে থাকে। কখনো সেটা গোষ্ঠী পর্যায়ে, আবার কখনো সেটা সংগঠনের পর্যায়ে।

আমরা যারা বুয়েটে একই ব্যাচে পড়াশোনা করেছি, তারাও প্রতিবছর শীতকালে পিঠা উৎসবের আয়োজন করে থাকি। অবশ্য কথাটা হবে, আমাদের বন্ধুদের স্ত্রীরা এটা আয়োজন করে থাকেন। শুরুতেই তাঁরা মেসেঞ্জারে একটা গ্রুপ তৈরি করে নেন। তারপর তাঁরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়ে সেই মোতাবেক প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

সিডনিতে পথিক ৯৮-এর শীতকালীন পিঠা উৎসব

সিডনিতে পথিক ৯৮-এর শীতকালীন পিঠা উৎসবভাবিরা পিঠা উৎসবের প্রস্তুতি নিতে থাকুন, এই ফাঁকে আমরা একটু সময়ের গাড়িতে চড়ে ১৯৯৯ সাল থেকে ঘুরে আসি। ১৯৯৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে আমি বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিই। তারপর সুযোগ পেয়ে দ্রুতই ভর্তি হয়ে গেলাম। কিন্তু ক্লাস আর শুরু হয় না। অবশেষে আমাদের ক্লাস শুরু হলো ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর।

এই তারিখটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুল-কলেজ পাস করে এসে আমরা একই সঙ্গে প্রায় পাঁচটি বছর একত্রে কাটালাম বুয়েটের ক্যাম্পাসে। দিনে দিনে একে অপরকে বুঝতে শিখলাম। বন্ধুত্বের প্রকৃত রূপ সম্বন্ধে ধারণা তৈরি হলো। পাস করে সবাই নিজ নিজ কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে গেলেও বন্ধুদের বেলায় সময় বের করাটা কোনোভাবেই আটকে থাকে না। এরপর আমাদের প্রত্যেকেরই আলাদা সংসার হয়েছে। সেই সংসার আলো করে এসেছে এক দঙ্গল বাচ্চাকাচ্চা।

আমরা যখন নিজেরা একত্র হয়ে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিই, তখন আমাদের সহধর্মিণীরাও আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে যেন এরা সবাই একই ক্যাম্পাসের বহুদিনের পুরোনো বন্ধু। আমাদের সবকিছুরই সমান ভাগীদার আমাদের অর্ধাঙ্গিনীরা। তাঁদের সহযোগিতা না পেলে কখনোই আমাদের একত্র হওয়া সম্ভব ছিল না। আর আমাদের বাচ্চাকাচ্চাগুলোকে একসঙ্গে দেখলে মনে হয় যেন তারা সবাই একটা একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য। নিজেদের মধ্যে কেমন করে জানি তারা একটা বোঝাপড়া তৈরি করে নিয়েছে। ওরা যখন আড্ডা দেয়, তখন আমি মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে দেখে অবাক হয়ে যাই। বছরে হয়তোবা মাত্র দু-তিনবার তাদের মধ্যে দেখা হয়। কিন্তু তারা ঠিকই একে অপরকে মনে রাখে।

ফিরে আসি এবারের আয়োজনে। অস্ট্রেলিয়ার চার ঋতুর মধ্যে এখন চলছে শীতকাল। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে সারা বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারও আবহাওয়া দিন দিন চরমভাবাপন্ন হয়ে যাচ্ছে। গরমকালে যেমন ভয়ংকর রকমের গরম পড়ে, আবার শীতকালে প্রচণ্ড রকমের ঠান্ডা পড়ে।

এবার শীতের শুরু থেকেই পিঠা উৎসবের পরিকল্পনা করেছিলেন আমাদের সহধর্মিণীরা। কুমু ভাবি, জিনাত ভাবি, পিনু ভাবি, বনু ভাবি, শাকিলা ভাবি, ফারিবা ভাবি, লাবণ্য ভাবি, নুসরাত ভাবি, আমাদের বান্ধবী কাম ভাবি তানজিলা আর আমাদের আরেক বান্ধবী রিফাত সবাই মিলে মেসেঞ্জারে একটা গ্রুপ তৈরি করে ফেললেন। তারপর চলল পিঠা উৎসবের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও সেটাকে সফল করার জন্য আয়োজন।

এ বছর উৎসবের স্থান নির্ধারিত হয়েছিল বন্ধু আসাদ আর তার সহধর্মিণী কুমু ভাবিদের বাসা। তাই সিংহভাগ দায়িত্ব তাদের ঘাড়েই বর্তাল। সবাই তাদের নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে সেই মোতাবেক একেকটা আইটেম তৈরি করে ফেলল। তারপর ১৩ জুলাই দুপুরে সবাই হাজির হয়ে গেল কুমু ভাবির বাসায়। সবাই আসতে পারলেও বন্ধু পিয়াস, সুজন, দীপ ও সৌমেনের পরিবার আসতে পারেনি ব্যস্ততার কারণে।

নামে পিঠা উৎসব হলেও এটা আসলে ছিল আমাদের ব্যাচের একটা পুনর্মিলনীর মতো। তাই দুপুরের খাবারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবাই চলে আসার পর শুরু হলো খাবারগুলো সাজিয়ে পরিবেশনের পালা। পদগুলো গুনে দেখলাম সেখানে ভর্তাই আছে ১০ রকমের। রান্নাঘর বিষয়ে আমার যতটুকু অভিজ্ঞতা, সেখান থেকে জানি খাবার তৈরি করা আসলে একটা শিল্প। মসলার সামান্য তারতম্যে স্বাদের আকাশ-পাতাল তফাত হয়ে যায়। কিন্তু খেতে শুরু করে আমরা বুঝলাম, প্রতিটি পদই সুস্বাদু হয়েছে।

সিডনিতে পথিক ৯৮-এর শীতকালীন পিঠা উৎসবসিডনিতে পথিক ৯৮-এর শীতকালীন পিঠা উৎসবদুপুরের খাবারের শুরুতেই আমরা বাচ্চাদের প্রথমে খাইয়ে দিলাম। যাতে তারা তাদের মতো করে বিরামহীন খেলাধুলা করতে পারে। তারপর আমরা সবাই খাবার নিয়ে নিলাম। খাবারের পাশাপাশি চলল আড্ডা। সেখানে বন্ধুরা ও ভাবিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিলেন। আমাদের মধ্যে একমাত্র ব্যাচেলর হচ্ছে বন্ধু রায়হান। ব্যাচেলর বলেই হয়তো ওর কণ্ঠস্বর সব সময়ই জোরালো। তাই আড্ডায় আমরা সবাই মিলে বলি অর্ধেক কথা আর সে একাই বলে অর্ধেক কথা। এভাবে একসময় দুপুরের খাবার শেষ হলো।

বিকেলে পরিবেশন করা হলো বাহারি স্বাদের ও নকশার বাংলাদেশের পিঠা। যদিও সেগুলো সাত সমুদ্র তেরো নদীর এই পারে পরম মমতায় তৈরি করেছেন আমাদের ভাবিরা। আমরা পিঠা সাজিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। তখন খেয়াল করে দেখি আমাদের বাচ্চারা একে একে এসে তাদের নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী পিঠা নিয়ে যাচ্ছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন শীতকালে মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে পিঠা খাওয়ার জন্য। প্রতিটা পিঠাই ছিল অনেক সুস্বাদু। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। এরপর শুরু হলো শীতকালের সিগনেচার ভাপা পিঠা তৈরি। সেখানে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করলেন বন্ধু রনির মা ও স্ত্রী।

আমাদের এই পিঠা উৎসবে অতিথি হয়ে এসেছিলেন দুই গুরুজন। বন্ধু রনি ও বান্ধবী তানজিনার মা। তাঁরা থাকায় আমাদের এই উৎসব যেন একেবারে পূর্ণমাত্রা পেয়েছিল। আসলেই আমাদের জীবনে গুরুজনদের প্রয়োজন কখনো ফুরিয়ে যায় না। সেটা আজও আবার তাঁরা প্রমাণ করে দিলেন আমাদের জন্য গরম-গরম ভাপা পিঠা বানিয়ে। ভাপা পিঠা আগে থেকেই তাঁরা তৈরি করে রাখেননি। কারণ, শক্ত হয়ে গেলে আর খাওয়া যাবে না। বন্ধু আসাদ বাংলা দোকান থেকে কিনে আনা প্যাকেটজাত খেজুরের পাটালি গুড় কেটে দিয়ে ভাবিদের সহযোগিতা করল। তারপর গরম-গরম ভাপা পিঠা তৈরি হচ্ছিল আর সবাইকে গরম-গরম পরিবেশন করা হচ্ছিল। ভাপা পিঠা খেয়ে সবাই একবাক্যে স্বীকার করল, এটা সুস্বাদু হয়েছে।

সিডনিতে পথিক ৯৮-এর শীতকালীন পিঠা উৎসব

সিডনিতে পথিক ৯৮-এর শীতকালীন পিঠা উৎসবপিঠা খাওয়া চলতে থাকল। ইতিমধ্যেই বন্ধু আলম তার গাড়ি থেকে কার্ড নিয়ে এল। তখন গালিব, রায়হান, ইউসুফ আর সাব্বির বসে গেল কার্ড নিয়ে। ওরা টুয়েন্টি নাইন খেলছিল আর আশিক, মুকি, সাইফ, রনি বিভিন্নভাবে ওদের উৎসাহ দিচ্ছিল। আমাদের ব্যাচের একমাত্র দুলাভাই জাহিদ, বান্ধবী রিফাতের স্বামী আমাদের একই ব্যাচের হওয়ায় আমাদের বন্ধু হয়ে গেছে এত দিনে। সেও আমাদের আড্ডায় অংশ নিচ্ছিল সমান তালে।

কার্ড খেলাটা বুয়েটের ছাত্রদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার ধারণা, তারা বুয়েট–জীবনে যে পরিমাণ সময় কার্ড খেলার পেছনে নষ্ট করেছে, তার চার ভাগের এক ভাগ বুয়েটের পড়াশোনার প্রতি দিলে তারা সবাই বুয়েটের শিক্ষক হওয়ার মতো ফল করতে পারত। অবশ্য কার্ড খেলাটা ছিল শুধুই একটা সুন্দর সময় অতিবাহিত করার উপকরণ। আর টোয়েন্টি নাইন হচ্ছে সবচেয়ে প্রচলিত খেলা। অনেকেই অবশ্য কল ব্রিজ খেলত। আর যারা একটু বেশি ম্যাচিউর ছিল, তারা খেলত ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ।

যা হোক, এভাবে চলতে চলতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল আর বিকেল গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে আমরা খেয়ালই করিনি। এরপর সবাইকে উঠতে হলো। কারণ, আসাদের লুমিয়ার বাসা থেকে অনেককেই প্রায় ঘণ্টাখানেক ড্রাইভ করে ফিরতে হবে। ফেরার সময় সবাই আসাদ আর কুমু ভাবিকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিল এমন একটা আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। আসলে প্রবাসজীবনের যান্ত্রিকতায় এমন উপলক্ষগুলো হচ্ছে একটু স্বাধীনভাবে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ। তাই সবাই খুবই উপভোগ করে। আমাদের ক্ষেত্রে সেই মাত্রাটা একটু বেশি। কারণ, আমাদের এই পরিচয় প্রায় ২০ বছরের পুরোনো।

Add Comment